ইউরোপের ঘরোয়া ফুটবলের আদি চ্যাম্পিয়নরা                                  প্রবন্ধ 

অপলক ভট্টাচার্য্য 


স্পেনের প্রথম জাতীয় লীগ চ্যাম্পিয়ন দলঃ বার্সে‌লোনা ১৯২৮-২৯

    ফুটবল খেলাটাতে প্রত্যেক বছর একই প্রতিযোগিতার একেকটা সংস্করণ হওয়ায় ফুটবলের মধ্যে ঐতিহাসিকতার একটা সহজবোধ্য পরম্পরা চলে আসে। সে কারণেই আমরা ফুটবলে অনেক আগেকার কৃতিত্বের সাথে এখনকার কৃতিত্বের তুলনা করতে পারি, ঐতিহ্যের গাম্ভীর্যকে বিরাট মর্যাদা দিতে পারি, অতীত দল, ঘটনা, ট্যাকটিকস বা গোলের পরম্পরাগত উত্তরাধিকার দাবি করতে পারি। কিন্তু ফুটবলের নানান প্রতিযোগিতার ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায় যে ফুটবলের আদিযুগে খেলার ধরণ-ধারণ ঠিক এখনকার মত ছিল না। বহু দেশেই লিগ ফরম্যাট এসেছে অনেক দেরিতে। যদিও পুরোদস্তুর লিগ ফরম্যাটে জাতীয় প্রতিযোগিতা খেলাটা এখন আমাদের স্বতঃসিদ্ধ মনে হয়, কারণ ধীরে ধীরে এটাই হয়ে যায় প্রচলিত রীতি। সারা দুনিয়ায় হেন ফুটবলখেলিয়ে দেশ নেই, যেখানে জাতীয় লিগ খেলা হয়না। বিশ্বের সবচেয়ে বিপণনযোগ্য লিগগুলো অবশ্য সবই ইউরোপে। ব্রাজিল, আর্জেন্তিনা, মেক্সিকো বা জাপানের ফুটবল লিগ নিয়ে যতই উন্মাদনা থাক না কেন, সেই উন্মাদনা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিফলিত হয়না। ইদানিং কালে লিওনেল মেসি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লিগে এবং রোনাল্ডো সৌদি আরবের লিগে খেলছেন নিজেদের কেরিয়ারের প্রান্তবেলায়। মানবাধিকার-বিরোধিতার খতিয়ানের থেকে চোখ সরানোর চেষ্টায় মত্ত স্বৈরতান্ত্রিক সৌদি রাজপরিবার সৌদি আরবের লিগে প্রচুর টাকা ঢেলেছে। তাই সেই লিগে এখন তারকার ছড়াছড়ি। তবুও বিশ্ব বাজারে সৌদি লিগ বা মার্কিন লিগ তেমন প্রভাব ফেলতে অক্ষম যেমনটা ফেলতে পারলে ইউরোপের বড়ো লিগগুলোকে শঙ্কিত হতে হবে।

   ইউরোপের বড়ো লীগগুলোর সবকটাই পশ্চিম ইউরোপের দেশের লীগ। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই অঞ্চলের প্রভাব এখন হ্রাস পেলেও ফুটবলের পৃথিবীতে তাদের পুরোনো ঠাঁটবাঁট ঠিকই বজায় আছে। গত এক-দেড় দশকে টপ-ফাইভ লীগ বলতে আমরা বুঝে এসেছি ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি, জার্মানি আর ফ্রান্সের জাতীয় লীগগুলোকেই। এই পাঁচটার অব্যবহিত পেছনেই নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল আর বেলজিয়ামের লীগ। এই আটটা পশ্চিম ইউরোপীয় দেশই এককালে ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে অধিকার করে রেখেছিল পৃথিবীর অনেকখানি এলাকা।

   ফুটবলের আদিযুগে ছিল নকআউট কাপের রমরমা। প্রথমদিকের জাতীয় প্রতিযোগিতাগুলোকে এখনকার লিগের পূর্বসূরি হিসেবে গণ্য করা হলেও, অনেক সময়েই সেগুলো নকআউট পদ্ধতিতেই নির্ধারিত হতো। আবার অনেক দেশে প্রথমদিকে ফুটবল অপেশাদার খেলা ছিল। অনেক পরে পেশাদারী ফুটবল শুরু হয়। কাজেই অনেক দেশেই লিগ ফুটবলের ইতিহাসকে অ্যামেচার যুগ"। 

    আর প্রফেশনাল যুগে ভাগ করা হয়ে থাকে। অবশ্য ফুটবলে লিগ খেলার শুরুয়াত হয়েছিল যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, ১৮৮৮তে চালু হওয়া ইংল্যান্ডের সেই "ফুটবল লিগ"-এর আত্মপ্রকাশ করার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের দ্বারা পেশাদারিত্বের বিরোধিতা। ফুটবল খেলাটা বড়োলোকের শখ না হয়ে, গরীবের নুন-রুটির ব্যবস্থা করবে, এমনটা যে সব ক্লাব চাইত, সেসব ক্লাবই ছিল ফুটবল লিগের পুরোভাগে। কিন্তু লিগের মডেল ফুটবলে গৃহীত হতে সময় লেগেছিল অনেক। যে দেশের লিগ এখন বিশ্বের সবচাইতে সমাদৃত ফুটবল প্রতিযোগিতা, সেই ইংল্যান্ডেই ফুটবলের ইতিহাসের অধিকাংশ সময় জুড়ে জাতীয় নকআউট প্রতিযোগিতা এফএ কাপকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্পেনীয় লিগের থেকেও বেশি তাৎপর্য কোপা দেল রে'র ছিল অনেকদিন অব্দি। তবে অনেক দেশেই অবশ্য জাতীয় কাপ প্রতিযোগিতা পরবর্তী কালে এসেছে।

   যেহেতু অনেক ক্ষেত্রেই আগে চালু হওয়া তথাকথিত লিগ টুর্নামেন্ট গুলোর ফরম্যাট মোটেই লিগ সিস্টেমের অনুসারী ছিল না। তাই এইরকম জাতীয় "লীগ টুর্নামেন্ট"এর জায়গায় বোঝার সুবিধের জন্যে আমরা প্রয়োগ করব "চ্যাম্পিয়নশিপ" শব্দটা।

  তখন নিয়মকানুন ছিল অনেক শিথিল, ক্লাবগুলো ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে যেত, খেলাও অনেক সময়ে এলোমেলো হতো। আর তাই  ফুটবলের এই যুগের থেকে ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার দাবি করার প্রক্রিয়াটা হয়ে আসে ধোঁয়াটে। অতএব আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে সোনালী ঐতিহ্যের ছবি আঁকবার পক্ষে এই সময়টা একটু অসুবিধেজনক। সে কারণেই বোধহয় এই যুগের প্রতিযোগিতাগুলোর রঙিন ইতিহাস আধুনিক ফুটবল ফ্যানদের কাছে অনেকটাই অল্প জানা। তাই আধুনিক যুগে যেসব দেশের ঘরোয়া ফুটবল অত্যন্ত জনপ্রিয়, সেসব দেশের একেবারে প্রথম ফুটবল মরসুমের অশ্রুতপ্রায় চ্যাম্পিয়ন দলগুলোর গল্প আমরা প্রায় ভুলতেই বসেছি। সেটা খানিক শুধরে নিতেই এই প্রবন্ধের অবতারণা।

 

নেদারল্যান্ডস

   নেদারল্যান্ডসের প্রথম চ্যাম্পিয়নশিপ চালু হয় ১৮৮৮ সালে। ঠিক লিগ বলা যাবেনা সেটাকে। যদি এইটা লিগ হতো তাহলে ১৮৮৮র সেপ্টেম্বরে ইংল্যান্ডে শুরু হওয়া ফুটবল লিগের বদলে আগস্ট মাসে চালু হওয়া এই প্রতিযোগিতাই ফুটবল ইতিহাসের প্রথম লিগ প্রতিযোগিতা হতো। সাতটা টিম খেলেছিল প্রতিযোগিতাটায়। কিন্তু সমান সংখ্যক ম্যাচ খেলেনি তারা। দুটো টিম সাতটা করে, দুটো টিম ছটা করে, একটা টিম পাঁচটা, একটা টিম দুটো আর একটা টিম মাত্র একটা ম্যাচ খেলে। ৫টা জিতে, আর ১টা করে ম্যাচ হেরে আর ড্র করে ১১ পয়েন্ট তুলে প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে রটারড্যামের দল ভ্যোয়েটবল ভেরেনিজিং কনকর্ডিয়া। এই সময়ে নেদারল্যান্ডসে অ্যামেচার ফুটবলের যুগ। কনকর্ডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৮৭ সালে। ক্লাবটা টিকেছিল মাত্র চার বছর। প্রথম ডাচ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা ছাড়া আর কোনও বলার মত কৃতিত্বও নেই তাদের।

   ১৮৯১ সালে অলিম্পিয়া রটারড্যাম ক্লাবের সাথে কনকর্ডিয়া মার্জ করে যায়। এখন এই মার্জার ক্লাবটার নাম ভিওসি রটারড্যাম। নেদারল্যান্ডসের অ্যামেচার লিগে ফুটবল খেলে তারা। এর পাশাপাশি এই ক্লাব নেদারল্যান্ডসের ঘরোয়া ক্রিকেটে অত্যন্ত সফল। ভিওসি রটারড্যাম গত শতকের শুরুর দিকে দুবার নেদারল্যান্ডসের জাতীয় কাপ প্রতিযোগিতা বা কেএনভিবি জিতেছে।

   কেএনভিবি জেতা প্রথম দলের গল্পও কতকটা কনকর্ডিয়ার মতই। ১৮৮৭ সালে অ্যামস্টারডামের তিনটি ক্রিকেট ক্লাব একসাথে জন্ম দেয় আরএপি ফুটবল ক্লাবের। ডাচ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম দশকে তারা বেশ সফলও হয়েছিল। পাঁচটি শিরোপা তারা ঘরে তোলে ঊনবিংশ শতক শেষ হবার আগেই। ১৮৯৯ সালে প্রথম অনুষ্ঠিত হয় এই কাপ প্রতিযোগিতা। আরএপি ১-০ গোলে ফাইনালে হারায় হেগের এইচভিভি ক্লাবকে। ১৯১৪ সালে আরএপি ফুটবল ক্লাব আরেকটি ফুটবল ক্লাবের সাথে মার্জ করে ফের বনে যায় একটি ক্রিকেট ক্লাব। সেই ভিআরএ ক্রিকেট ক্লাব এখন ডাচ ক্রিকেটে বেশ সাড়াজাগানো নাম।

   আরএপির ডাচ ফুটবল ইতিহাসে আরেকটা অবদান রয়েছে। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ অফিশিয়াল প্রতিযোগিতার স্টেটাস লাভ করার পর প্রথম টাইটেল তারাই জিতেছিল ১৮৯৯ সালে।

    নেদারল্যান্ডসে যখন পেশাদার ফুটবল ধীরে ধীরে শুরু হতে লাগল,‌ তখন প্রথম সেমিপ্রফেশনাল লিগ টাইটেল ১৯৫৪/৫৫ সিজনে জেতে টিলবুর্গের ক্লাব উইলেম টু। ইয়াপ স্ট্যাম, ফ্র্যাঙ্কি দে ইয়ং, ভার্জিল ভ্যান ডাইকের মত খেলোয়াড় পরবর্তী কালে উঠে এসেছেন উইলেম টুয়ের থেকে। এখন এই ক্লাব খেলে দ্বিতীয় ডিভিশনে। নেদারল্যান্ডসে পুরোপুরি পেশাদার লিগ চালু হবার পর প্রথম বিজয়ী দলের নামটা অবশ্য ফুটবল দুনিয়ায় সবার চেনাআয়াক্স, যা হয়ে ওঠে নেদারল্যান্ডসের সবচেয়ে বড় ক্লাব। ডাচ জাতীয় দল যে টোটাল ফুটবলের ম্যাজিকে দুনিয়াকে আচ্ছন্ন করবে সাতের দশকে, সেই ফুটবলের আঁতুড়ঘর হিসেবে ফুটবল ইতিহাসে আয়াক্সের স্থান চিরন্তন। 

 

বেলজিয়াম 

   বেলজিয়ামের ক্ষেত্রেও চ্যাম্পিয়নশিপ আগে এসেছিল কাপের চাইতে। তবে তাদের প্রথম চ্যাম্পিয়নশিপটা পুরোদস্তুর লিগ ফরম্যাটেই হয়। ১৮৯৫/৯৬ সিজনে প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয় এফসি লিয়েজে। ক্লাবটির গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৮৯২ সালে। শতাব্দী শেষ হবার আগেই তিনটে টাইটেল তাদের ঝুলিতে ভরেছিল এফসি লিয়েজে। তারপর আরও দুটো শিরোপা তারা জেতে ১৯৫২ আর৫৩ সালে। ষাটের দশকে একবার ইন্টারসিটি ফেয়ার্স কাপের সেমিফাইনাল অব্দি উঠেছিল তারা। আশির দশকেও ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে তাদের দেখা পাওয়া গেছিল। ১৯৯৫ সালে ক্লাবটা সর্বস্বান্ত হয়ে গেছিল। বিক্রি হয়ে গেছিল তাদের স্টেডিয়াম। বাধ্য হয়ে তারা মার্জ করে আরএফসি টিলেউর সেন্ট নিকোলাসের সাথে। এখন সেই ক্লাবের নাম আরএফসি লিয়েজে। তারা এখন খেলে দ্বিতীয় ডিভিশনে।

   বেলজিয়ামের ক্লাবগুলোর মধ্যে প্রথম বেলজিয়ান কাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯১২ সালে। নকআউট ফরম্যাটে খেলা হয়েছিল। ফাইনাল জেতে ১-০ ব্যবধানে আরসি ব্রুশেলেস। ১৯৯৪ সালে এই ফুটবল সাইডটির আত্মপ্রকাশ ব্রুশেলসের রয়াল রেসিং ক্লাবের ফুটবল টিম হিসেবে। বেলজিয়ান লিগের প্রথম ১৩ বছরের মধ্যে একটানা চারটে শিরোপা সমেত মোট ৬বার লিগ জিতেছিল তারা। তবে এরপর আর উল্লেখযোগ্য কোনও অর্জন নেই তাদের। ১৯৬৩ সালে সর্বস্বান্ত হবার পর অন্য একটি ক্লাবের সাথে মার্জ করে যায় তারা। এখন আরসি ব্রুশেলসের উত্তরসূরি ক্লাবের নাম কেএফসি রোডিয়েন ডে হোক। তারা খুব একটা বলবার মত ফুটবল খেলে না আর।

 

পর্তুগাল

   পর্তুগালে অবশ্য কাপই আগে এসেছিল। লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ আসে পরে। সেই লিগ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম সিজনে, ১৯৩৪/৩৫এ ১৪টি ম্যাচে দশটি জিতে শিরোপা জয় করে পর্তুগিজ ফুটবলের তিন প্রধানের অন্যতম - পোর্তো। ১৯২২এ হওয়া প্রথমবারের পর্তুগিজ কাপ টুর্নামেন্টে দল ছিল দুটিই - পোর্তো এবং পর্তুগালের তিন প্রধানের আরেক অংশীদার স্পোর্টিং। একটা মজাদার ফরম্যাটে ঠিক হয়েছিল তিনটে ম্যাচের মধ্যে যারা দুটো জিতবে, তাদেরকেই দেওয়া হবে কাপ। প্রথম ম্যাচ জেতে পোর্তো। পরেরটা জেতে স্পোর্টিং। তৃতীয় ম্যাচ ৯০ মিনিট অব্দি ১-১ ড্র থাকার পর, আধঘন্টা একস্ট্রা টাইমের খেলা শুরু হয়। তাতে দুটো গোল দিয়ে কাপ তোলে পোর্তো। এফসি পোর্তো প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯৩ সালে। তিরিশবার জাতীয় লিগ জিতেছে তারা। ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় তারা সফলতম পর্তুগিজ ক্লাব।


জার্মানি

   জার্মানিতে জাতীয় কাপ টুর্নামেন্ট এসেছিল বেশ পরে। ১৯৩৫ সালে। সেবার ফাইনালে শালকে-কে হারিয়ে এফসি ন্যুরেমবার্গ তোলে ট্রফি। ১৯০০ সালে পথচলা শুরু করা এই ক্লাব এখন খেলছে জার্মানির দ্বিতীয় ডিভিশনে। সাত বছরে পাঁচটা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে ১৯২০র দশকে ন্যুরেমবার্গই ছিল জার্মান ফুটবলের সবচেয়ে পরাক্রমশালী দল। অবশ্য গত অর্ধশতক জুড়ে অবশ্য বলবার মত কিছুই তারা জেতেনি।

   জার্মানিতে প্রথমবার জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজিত হয় ১৯০৩ সালে। জার্মানি জুড়ে মোটমাট তিরিশটি এলাকাভিত্তিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ছিল। এইসব অ্যাসোসিয়েশনের লোকাল টুর্নামেন্ট জিতে আসা টিমেরাই জার্মান চ্যাম্পিয়নশিপ খেলার সুযোগ পাবে, এমনটাই ঠিক হয়। শেষতক খেলতে আসে মাত্র ছটা টিম। তারমধ্যেও নানা বিভ্রাটে একটি দলের কোনও ম্যাচই খেলা হয়না।

   কার্যত দুটো বাই পেয়ে সে কারণে ফাইনালে ওঠে ডিএফসি প্রাগ। প্রাগ তখন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের বোহেমিয়া প্রদেশের রাজধানী। তখন প্রাগের যেসব ক্লাব জার্মান ভাষা ব্যবহার করতো, তাদের নিয়ে একটা ছোটখাট অ্যাসোসিয়েশন ছিল। তাদের মধ্যেই জিতে ডিএফসি প্রাগ এসেছিল জার্মান জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে।

   ফাইনালে ডিএফসি প্রাগের বিরুদ্ধে খেলেছিল ভিএফবি লাইপজিক। প্রথমার্ধে স্কোর ছিল ১-১। দ্বিতীয়ার্ধে লাইপজিক ছ’-টা গোল দেয়। ম্যাচ শেষ হয়েছিল ৭-২ স্কোরলাইনে। জার্মানির প্রথম জাতীয় চ্যাম্পিয়ন এই ভিএফবি লাইপজিক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯৬ সালে। ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ক্লাব - এসসি লাইপজিগ মার্জ করে যায় ভিএফবি লাইপজিকের সাথে, ১৮৯৮ সালে। মার্জ করা ক্লাবের নাম রাখা হয়েছিল ভিএফবি স্পোর্টব্রুডার ১৮৯৩ লাইপজিক। শীঘ্রই তারা অবশ্য ফিরে আসে তাদের আদি নামে। জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ছিয়াশিটি ফাইন্ডিং মেম্বারের মধ্যে একটি ছিল এই ক্লাব।


 ভিএফবি লাইপজিক ১৯০৩ চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে উঠেছিল ৩-১ এবং ৬-৩ ব্যবধানে দুটো ম্যাচ জিতে। ১৯০৬ আর ১৯১৩তে আরো দুটো টাইটেল তারা জিতেছিল। শক্তিশালী শালকেকে হারিয়ে তারা ১৯৩৬/৩৭এর জাতীয় কাপ প্রতিযোগিতাও জিতেছিল।

   বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির মানচিত্রে বিরাট রদবদল ঘটেছিল। সোভিয়েত রাশিয়ার অধীনে থাকাকালীন ক্লাবের সদস্যরা এসজি প্রবসথেইডা নামে খেলত। তারপর দুয়েকবার নাম বদলে অবশেষে ১৯৫৪ সালে এসসি রোটেশন লাইপজিকের সাথে মার্জ করে তারা তৎকালীন পূর্ব জার্মানির জাতীয় লীগে খেলা শুরু করে। বিভক্ত জার্মানিতে এরপর বহুবার মার্জিং এবং ভাগাভাগির মধ্যে দিয়ে যায় তারা। জার্মানির ইউনিফিকেশনের পরে তাদের উত্তরসূরি ক্লাব আবারও নেয় ভিএফবি লাইপজিক নামটা। তারা অবিভক্ত জার্মানির টপ ডিভিশন পৌঁছেও অত্যন্ত খারাপ প্রদর্শন করে। এই সহস্রাব্দের শুরুতে তারা নেমে গেছিল পঞ্চম ডিভিশনে। ২০০৪ সালে সর্বস্বান্ত হবার পর ক্লাবটি উঠে যায়। ক্লাবের ফ্যানেরা গড়ে তোলে একটি ফিনিক্স ক্লাব। যা এখন ওয়ান এফসি লোকোমোটিভ লাইপজিক নামে জার্মান ফুটবলের চতুর্থ ডিভিশনে খেলছে।

   পশ্চিম জার্মানিতে বুন্দেসলিগা শুরু হয় ১৯৬৩ সালে। সেই প্রথম জাতীয় পর্যায়ে পুরোদস্তুর লিগ খেলা হয় জার্মানিতে। সেই সিজনে লিগ জেতে এফসি কলন। দুবারের বুন্দেসলিগা চ্যাম্পিয়ন এই ক্লাব মাঝেমাঝে দ্বিতীয় ডিভিশনে নেমে গেলেও মোটামুটি টপ ফ্লাইটে নিজেদের জায়গা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। জার্মানির রিইউনিফিকেশনের পরে প্রথম বুন্দেসলিগা সিজনে জেতে ভিএফবি স্টুটগার্ট। তারা এখনও পর্যন্ত টপ ফ্লাইটে নিজেদের মৌরসিপাট্টা ভাল মতই বজায় রেখেছে।


স্পেন

   স্পেনে কিন্তু ইংল্যান্ড বা পর্তুগালের মতই জাতীয় কাপ এসেছিল জাতীয় লীগের আগে। ১৯২৯ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম লা লিগা সিজনে দশ টিমের লীগে বার্সেলোনা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সেই টিমের অন্যতম তারকা ছিলেন জোসেপ সামিতিয়ের, যাঁর অবিশ্বাস্য খেলা দেখে ভক্তরা তাঁকে ডাকত "দ্য সারিয়ালিস্ট" বলে।


   বিশ্ববিখ্যাত ক্লাব বার্সেলোনার ব্যাপারে আলাদা করে আর কিছু বলা বাহুল্য। প্রথম কোপা দেল রে চ্যাম্পিয়ন দলটি অতটা খ্যাতনামা না হলেও, ফুটবল ফ্যানেরা সেটিকে একডাকে চিনবেন। ১৯০৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম কোপা দেল রে ফাইনালটা অ্যাথলেটিক বিলবাও জেতে ৩-২ ব্যবধানে। তারা হারিয়েছিল মাদ্রিদ এফসিকে, পরবর্তীকালে যে ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ হিসেবে দুনিয়াজোড়া নাম করে। বাস্ক প্রদেশের ক্লাব অ্যাথলেটিক বিলবাও ৮ খানা লা লিগা আর ২৩ টা কোপা দেল রে জিতেছে। ১৯২০ আর ১৯৩০র দশকে ফ্রেড পেন্টল্যান্ডের তত্ত্বাবধানে তারা যে ছোটপাসের ফুটবল খেলত, অনেক পণ্ডিত সেই খেলাকেই পরবর্তীকালের টিকিটাকা ফুটবলের আদি সংস্করণ বলে মানেন। রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনা বাদে এই অ্যাথলেটিক বিলবাওই একমাত্র টিম যারা কখনোই প্রথম ডিভিশনের থেকে রেলিগেটেড হয়নি। ১৯১২ সাল থেকে অ্যাথলেটিক বিলবাও স্রেফ বাস্ক খেলোয়াড়দেরই টিমে নিয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের পৃথিবীতেও আশ্চর্যভাবে তারা তাদের এই সিদ্ধান্তে অটল। গত চার দশকে তেমন উল্লেখযোগ্য ট্রফি না জিতলেও তাদের পলিসির পরিবর্তন হয়নি।


ফ্রান্স

   ফ্রান্সের ফুটবলে পেশাদারিত্ব আসবার অনেক আগেই ইউনিয়ন অফ ফ্রেঞ্চ অ্যাথলেটিক স্পোর্টস সোসাইটিজ ১৮৯৪ সালে প্রথমবার ফরাসি দেশে জাতীয় ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেয়। খেলেছিল ছটা ক্লাব। ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল স্ট্যান্ডার্ড অ্যাথলেটিক ক্লাব আর হোয়াইট রোভার্স। শক্তিশালী দল রোভার্সের তারকা ডিফেন্ডার বেইন ব্যথায় কাবু হয়ে বেরিয়ে যাওয়া (সে যুগে খেলোয়াড় পরিবর্তন হতো না) সত্ত্বেও হোয়াইট রোভার্স ম্যাচটা ২-২ ড্র রেখেছিল। বিজয়ী নির্ধারণ করতে এক সপ্তাহ বাদে রিপ্লে হয়। বেইন তখনও সেরে ওঠেননি। তা সত্ত্বেও হোয়াইট রোভার্সই ছিল ফেভারিট। কিন্তু এবার স্ট্যান্ডার্ড অনেকটাই ভাল প্রদর্শন করে ২-০ ব্যবধানে ম্যাচটা জিতে নিয়েছিল।

     ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত প্যারিস অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল ক্লাব আর ১৮৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত গর্ডন ফুটবল ক্লাবের সংযুক্তি হয় ১৮৯২ সালে। সেই সংযুক্ত ক্লাবটির নাম দেওয়া হয় স্ট্যান্ডার্ড অ্যাথলেটিক ক্লাব। তখন ফ্রান্সে ফুটবল খেলত মূলত অভিবাসী ব্রিটিশরাই। এই স্ট্যান্ডার্ড অ্যাথলেটিক ক্লাবের বেশিরভাগ খেলোয়াড় ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। খোদ আইফেল টাওয়ার নির্মাণের কাজে তাঁরা এসেছিলেন প্যারিসে। ফ্রেঞ্চ ইতিহাসে তাই প্রথম চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা ছাড়াও বিরাট অবদান আছে এই খেলোয়াড়দের।

স্ট্যান্ডার্ড অ্যাথলেটিক ক্লাব ১৮৯৪ থেকে ১৮৯৮এর মধ্যে ফ্রেঞ্চ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম পাঁচ সিজনের মধ্যে জিতেছিল চারটে । তারপর ১৯০১ সালে তারা নিজেদের পঞ্চম এবং শেষ টাইটেল জেতে। ১৮৯০এর দশকের প্রথমার্ধে যাকে ফ্রান্সের সেরা ফুটবল ক্লাব মনে করা হতো, সেই হোয়াইট রোভার্স পরপর চারটে ফাইনাল খেলে একটিও জেতেনি। অদ্ভুত শোচনীয় ট্র্যাজেডি।

    স্ট্যান্ডার্ড অ্যাথলেটিক ক্লাব আজ নেহাতই পাড়ার টিম। বিংশ শতকের শুরুর থেকেই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে এসেছিল তারা। তবুও তারা ছিল ফ্রেঞ্চ জাতীয় কাপ প্রতিযোগিতা ক্যুপ দে ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। স্ট্যান্ডার্ড অ্যাথলেটিক ক্লাবের থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই নিজেদের নামকরণ করে বেলজিয়ান ক্লাব স্ট্যান্ডার্ড লিয়েজে। এছাড়াও অলিম্পিক ইতিহাসের একমাত্র ক্রিকেট ম্যাচে, ১৯০০ সালের প্যারিস অলিম্পিকে মুখোমুখি হয়েছিল গ্রেট ব্রিটেন আর ফ্রান্স। ফ্রান্সের টিম ছিল অভিবাসী ব্রিটিশ খেলোয়াড়ে ভরা। টুয়েলভ আ সাইড খেলা হয়েছিল সেই ম্যাচ। গ্রেট ব্রিটেন ১৫৮ রানে তা জিতে সোনার মেডেল লাভ করে। ফ্রান্সের টিমের খেলোয়াড়রা এসেছিলেন ইউনিয়ন ক্লাব এবং স্ট্যান্ডার্ড অ্যাথলেটিক ক্লাবের থেকেই। তাঁরা একমাত্র ম্যাচটি হেরে রুপোর পদক পান।

   ১৯৩২/৩৩ সিজনে প্রথমবার ফ্রান্সে পেশাদার চ্যাম্পিয়নশিপ খেলা শুরু হয়। সেবার বিজয়ী হয়েছিল অলিম্পিক লিল। কুড়িটা দলকে দুটো গ্রুপে ভাগ করে নেওয়া হয়েছিল প্রথমে। দুই গ্রুপের প্রথম হওয়া টিমদুটোর মধ্যে তারপর হয়েছিল নির্ণায়ক ফাইনাল ম্যাচ। গ্রুপ এ জিতে এসে অলিম্পিক লিল উঠে মুখোমুখি হয়েছিল গ্রুপ বি'র থেকে উঠে আসা আসা এএস কানের। প্রথমার্ধে দুই গোলে এগিয়ে যায় লিল। কান দ্বিতীয়ার্ধে একটা গোল শোধ করার পরেই তিন নম্বর গোল দিয়ে দেয় লিল। তারপর কান পরপর দুটো গোল করে বিরাশি মিনিটে সমতা ফিরিয়ে আনে। কিন্তু লিল চতুর্থ গোল দিয়ে ম্যাচটা জিতে যায় ৪-৩ ব্যবধানে।

    অলিম্পিক লিল পরবর্তীকালে মার্জ করে যায় স্পোর্টিং ক্লাব ফাইভসের সাথে। জন্ম হয় লিল অলিম্পিক স্পোর্টিং ক্লাবের। এই নবীন ক্লাব যুদ্ধপরবর্তী যুগে একটানা সাফল্য পেয়েছিল। এখনও অব্দি ছ'বার ক্যুপ দ্য ফ্রান্স আর চারবার ফরাসি লিগ জিতেছে এই দল। তারমধ্যে একটা লিগ টাইটেল এসেছে ২০২০/২১ সিজনেই। এখনও ফ্রেঞ্চ প্রথম ডিভিশনে অন্যতম শক্তিশালী দল এই লিল।

    ট্রফি দে ফ্রান্স বলে একটা প্রতিযোগিতা চলেছিল ১৯০৭ থেকে ১৯১৬ অব্দি। ফ্রান্সে তখন নানান স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন এবং ফেডারেশন অ্যাকটিভ ছিল। তাদের চ্যাম্পিয়নদের মধ্যেই খেলা হতো এই টুর্নামেন্ট। জিতলে দেওয়া হতো একটা শিল্ড। প্রথমবার এটা জিতেছিল "জিমন্যাস্টিকস অ্যান্ড স্পোর্টস ফেডারেশন অফ ফ্রেঞ্চ প্যাট্রোনেজ"এর সদস্য দল "এতয়ে দে দু লাকস"। এই ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯৮ সালে। কখনোই পেশাদার ফুটবল খেলেনি তারা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই ক্লাবের আর কোনও খবর সেভাবে পাওয়া যায়না।

    ফ্রান্সে প্রথম জাতীয় কাপ টুর্নামেন্ট হয় ১৯১৮ সালে। তখন এর নাম ছিল চার্লস-সিমন কাপ। প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল অলিম্পিক দে প্যান্তিন। ফাইনালে তারা হারায় ফুটবল ক্লাব লিওনকে। লিওনের গোলকিপার কার্লোস মুত্তি ছিলেন উরুগুইয়ান। তিনি ফরেন লেজিয়নের অংশ হিসেবে ফ্রন্টে গেছিলেন ফাইনাল ম্যাচের কিছুদিন আগে। ফিরে আসার জন্যে তাঁকে ছাড় দেওয়া সত্ত্বেও তিনি তা নেননি যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে ফিরে আসবেন না বলে। আগস্ট মাসে তিনি হন বিশ্বযুদ্ধের শহীদ

    ১৮৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত অলিম্পিক দে প্যান্তিন ৩-০ গোলে প্রথম ক্যুপ দে ফ্রান্স ফাইনাল জিতে আবার পরের সিজনে ফাইনালে উঠেছিল। এবার তারা হেরে যায় একস্ট্রা টাইমে। তবে আরেকটা ক্যুপ দে ফ্রান্স তারা জেতে ১৯২১ সালে। অলিম্পিক ১৯২০র দশকের শুরুর দিকে ছিল প্যারিসের ফুটবলে এক সাড়া জাগানো নাম। কিন্তু ১৯২০র দশকের মাঝামাঝি তারা দেনার চাপে একেবারেই নুয়ে পড়ে। তখন তাদের প্রতিপক্ষ রেড স্টার ক্লাবের সাথেই তাদের সংযুক্ত হয়ে যেতে হয়। নতুন মার্জার ক্লাবের নাম হয় রেড স্টার অলিম্পিক। রেড স্টার পরবর্তীকালে ফ্রান্সে প্রথম পেশাদার লিগ সিজনে টপ ডিভিশনে খেলার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু সেই সিজনেই তারা রেলিগেটেড হয়ে যায়। এরপর লেগেই থেকেছে ওঠানামা। বেশিরভাগ সময়ে অবশ্য তারা নিচের ডিভিশনগুলোতেই খেলেছে। রেড স্টার এখন খেলে ফ্রান্সের ফুটবল লিগের তৃতীয় ডিভিশনে।

ইতালি

    ইতালিতে প্রথম দিককার ক্লাবগুলো পথচলা শুরু করে ১৮৯০এর দশকে। এই ক্লাবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ক্লাব জেনোয়া ক্রিকেট অ্যান্ড অ্যাথলেটিক ক্লাব। ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবে একেবারে শুরুতে ফুটবলের চল তেমন ছিল না। ১৮৯৬ সালে জেনোয়ায় যোগ দেন জেমস স্পেন্সলি নামে এক ডাক্তারবাবু। তিনিই জেনোয়া ক্লাবে ফুটবল খেলায় জোর দিয়েছিলেন। ফুটবল খুব তাড়াতাড়িই ক্লাবের অন্যতম সফল খেলা হয়ে দাঁড়ায়। ১৮৯৯ সালে তাই ক্লাবের নাম বদলে রাখা হয় জেনোয়া ক্রিকেট অ্যান্ড ফুটবল ক্লাব। যে নাম আজও চালু।     

   ১৮৯৮ সালে ইতালির প্রথম চ্যাম্পিয়নশিপের সময়ে অবশ্য জেনোয়ার নামে ফুটবলের কথা একেবারেই ছিল না। কিন্তু তাতে তাদের জেতা আটকায়নি। তুরিনেই খেলা হয়েছিল সবকটা ম্যাচ, একই দিনে। চারটে দল ছিল সেই প্রতিযোগিতায়। জেনোয়া বাদে সব ক্লাব তুরিনেরই। সকালে খেলা দুটো সেমিফাইনাল ম্যাচে জেতে ইন্তারন্যাশিওনাল দি তুরিন আর জেনোয়া। ফাইনালে নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ ড্র ছিল। একস্ট্রা টাইমে গোল দিয়ে ২-১ ব্যবধানে চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নেয় জেনোয়া। তাদের পক্ষ থেকে গোলে খেলেছিলেন স্বয়ং স্পেন্সলি।

   জেনোয়া ক্লাবের ইতিহাসে জোরালো প্রভাব ইংরেজদের। ক্লাবটার নামই প্রথমত পুরোপুরি ইংরেজি ভাষায়। তাছাড়া শুরুর দিকে এই ক্লাবে ইতালীয় কেউ সদস্য হতে পারত না। প্রথম চ্যাম্পিয়নশিপ খেলার আগের বছরই অবশ্য স্পেন্সলির নেতৃত্বে ইতালীয় খেলোয়াড়দের ক্লাবে জায়গা দেওয়া হয়। তবে পাশাপাশি ব্রিটিশ সদস্যদের জন্যে একটা কোটার ব্যবস্থাও ছিল। ইতালির প্রথম জাতীয় চ্যাম্পিয়ন দলের প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড়ই আদতে ছিলেন বিদেশি।

    ১৮৯৮এর পরের দুটো চ্যাম্পিয়নশিপও জেনোয়াই জিতেছিল। ১৯০১ সালে তারা ইউনিয়ন জ্যাকের আদলে নিজেদের জার্সির রং বেছে নেয় ব্রিটেনের রাণী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর পর। জেনোয়া ১৯০২, ১৯০৩, ১৯০৪ সালে টাইটেলের হ্যাট্রিক করে আবারও। ইতালীয় ফুটবলের প্রথম সাত সিজনে তারা ছবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল এবং সাতবারই ফাইনালে উঠেছিল। এই সময়টাতে ক্লাবের নেতৃত্ব দিতেন স্পেন্সলি। জেনোয়ার ইতিহাসে তিনি এক অবিস্মরণীয় নাম। জেনোয়ার সপ্তম টাইটেল আসে বিশ্বযুদ্ধের কারণে খেলা বন্ধ হবার আগে শেষ সিজনে। তাদের শেষ দুটি শিরোপা এসেছিল ১৯২২/২৩ আর ১৯২৩/২৪ সালে। প্রসঙ্গত ১৯২৪ -এর টাইটেল জয়ের পরে তারা নিজেদের জার্সিতে তেরঙ্গা স্কুদেত্তো ব্যাজ এঁটেছিল। সেই প্রথা আজও ইতালীয় ফুটবলের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন টিম পালন করে।

    ১৯২৪/২৫ সিজনে টাইটেল জিতে আবারও হ্যাট্রিক করার প্রবল সম্ভাবনা ছিল তাদের। কিন্তু সেই সম্ভাবনায় জল ঢেলে দেয় বলোন্যা। ফ্যাসিস্ট পার্টি ততদিনে ক্ষমতা বেশ কায়েম করেছে ইতালিতে। সেই পার্টির সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলত বলোন্যা। গনগনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফুটতে থাকা বলোন্যা আর জেনোয়ার মধ্যে বিজয়ী বেছে নিতে লেগেছিল পাঁচটি টাই। প্রথম দুটি টাই যথাক্রমে জেনোয়া ও বলোন্যা জিতলেও, পরের দুটি ম্যাচ নানান বিতর্কিত ঘটনার ঘনঘটা সমেত, হয় ড্র। অবশেষে পঞ্চম ম্যাচে বলোন্যা ২-০ গোলে জয়লাভ করে। শাসকপক্ষের সাথে বলোন্যার যোগসাজশের সন্দেহ আরো দৃঢ় হয় জেনোয়ার খেলোয়াড় ও ফ্যানেদের মনে। এমনিও উগ্র জাতীয়তাবাদের পূজারী ফ্যাসিস্ট পার্টি ক্লাব কর্তৃপক্ষ এবং ভক্তদের আপত্তি সত্ত্বেও জেনোয়াকে বাধ্য করেছিল তাদের নামটার ইতালী-করণ করতে। ফ্যাসিস্ট পার্টির পতনের পরেই তারা নিজেদের ইংরেজি নামে ফিরে যায়।

    কাঙ্ক্ষিত দশম টাইটেল আজও ধাওয়া করে চলেছে জেনোয়া। ১৯২৭/২৮ আর ১৯২৯/৩০ সিজনে মাত্র দু পয়েন্টের জন্যে শিরোপা হাতছাড়া হয় তাদের। ১৯১২ থেকে ১৯২৭ অব্দি জেনোয়ার ম্যানেজার ছিলেন উইলিয়াম গারবুট। তাঁকে খেলোয়াড়েরা ডাকত ব্রিটিশ সম্বোধনসূচক শব্দ - "মিস্টার" বলে। আজও সে কারণে ইতালিতে ম্যানেজারদের মিস্টার বলবার রীতি রয়েছে। এই গারবুট পাইপ ফুঁকতেন খুব। ফুটবলের সত্য যুগের একজন পথিকৃৎ ম্যানেজার ছিলেন ইনি। ফুটবল ম্যানেজারের ভূমিকা রূপায়ণে তাঁর অবদান অনেকটাই।

   জেনোয়া নিচের দিকের ডিভিশনে তলিয়ে না গেলেও বিশেষ শক্তিশালী হিসেবে তারা প্রতিভাত তেমন আর হয়নি। ১৯২৩/২৪এ শেষ লিগ জয়ের সিজনের মত একশো বছর পরে ২০২৩/২৪ সিজনেও তারা খেলছে টপ ডিভিশন ফুটবল। কিন্তু টাইটেল জেতার সম্ভাবনা তাদের নেই বললেই চলে।

   ১৯২৯/৩০ সিজনে ইতালীয় ফুটবল লিগে প্রথমবার দেশজোড়া ক্লাব রাউন্ড-রবিন ফরম্যাটে খেলেছিল, আধুনিক যুগের মত। সেই সিজনে ট্রফি তোলে ইন্টার মিলান। তখন অবশ্য তাদের নাম ছিল অ্যামব্রোশিয়ানা। ইন্টার ভবিষ্যতে হয়ে ওঠে ইতালীয় এবং ইউরোপীয় ফুটবলের এক অন্যতম উল্লেখযোগ্য দল।

কোপা ইতালিয়া নিয়মিত খেলা শুরু হয় ত্রিশের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে। ইতালির অন্যতম সফল ক্লাব, টপ ডিভিশনে আজও নিয়মিত তোরিনো জিতেছিল ১৯৩৫-৩৬এর কোপা ইতালিয়া। কিন্তু তার প্রায় দেড় দশক আগে একটিবার ইতালির জাতীয় কাপ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সাঁইত্রিশটি দল অংশ নিয়েছিল এই টুর্নামেন্টে। তবে ইতালীয় ফুটবল ফেডারেশনের সাথে ঝামেলার জেরে বেশিরভাগ বড়ো ক্লাবই খেলেনি এই প্রতিযোগিতায়। টুর্নামেন্ট জিতেছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল ক্লাব ভাদো। তারা নিচু ডিভিশনে খেলত। টপ ফ্লাইটের বাইরের কোনো ক্লাব কোপা জেতার ঘটনা আবার ঘটবে ষাটের দশকে। তাই এই নজির বেশ বিরল। ভাদো হারিয়েছিল তুলনামূলকভাবে অনেকটাই প্রবলতর উদিনেজে ক্লাবকে। ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ভাদো কোনোদিনই নিজেদের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে পারেনি ইতালীর টপ লেভেলের ফুটবলে। তারা আঞ্চলিক লিগেই ফুটবল খেলেছে প্রধানত। আপাতত সেমিপ্রফেশনাল ফোর্থ ডিভিশনে খেলে তারা।

 

ইংল্যান্ড

   আধুনিক ফুটবলের পিতৃভূমিতে অবশ্য লিগ নয়, কাপই ছিল পরমতম ট্রফি। ১৮৭১/৭২ সিজনে খেলা হয় প্রথম এফএ কাপ। তেরোটা ম্যাচের সেই প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে ওয়ান্ডারার্স টিম। ফাইনালে একমাত্র গোলটি দিয়ে মর্টন বেটস ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখে ফেলেন।

 ওয়ান্ডারার্স ক্লাবটা ফুটবল ইতিহাসে বেশ ক্ষণস্থায়ী একটি দল। তাদের নাম ওয়ান্ডারার্স কারণ সত্যিই তাদের নিজস্ব কোনও মাঠ না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা লন্ডনের নানান মাঠে ঘুরে ঘুরে খেলত। ওয়ান্ডারার্সের খেলোয়াড়রা বেশিরভাগই ইংল্যান্ডের নানান বনেদি পাবলিক স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন। স্কুলবেলা শেষ হবার অনেক পরেও প্রিয় খেলা চালিয়ে যাবার ইচ্ছেতেই তারা একজোট হয়েছিলেন। যেহেতু ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে পাবলিক স্কুলেই ফুটবল খেলাটা হতো সবচেয়ে জবরদস্ত, সেহেতু ওয়ান্ডারার্স বেশ শক্তিশালী দল ছিল। ১৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠার সময়ে তাদের নাম ছিল ফরেস্ট ফুটবল ক্লাব। চার্লস উইলিয়াম অ্যালকক আর আর্থার কিনায়ার্ডের মত আধুনিক ক্রীড়া ইতিহাসের প্রকাণ্ড সব পথিকৃৎ চরিত্ররা এই ক্লাবে খেলেছেন। ১৯৬৩ সালে অ্যালককই ক্লাবের নাম রাখেন ওয়ান্ডারার্স।

   এফএ কাপের দ্বিতীয় সংস্করণও জিতেছিল ওয়ান্ডারার্স। ১৮৭৫/৭৬, ৭৬/৭৭ আর ৭৭/৭৮ সিজনে জিতে এফএ কাপের বিরল হ্যাট্রিক করে তারা  কিন্তু প্রথম সাত সিজনে পাঁচটি ট্রফি জেতার পর আর কোনোদিন এফএ কাপ জেতা হয়নি তাদের। ওয়ান্ডারার্সের ফর্মুলা মেনেই ১৮৭০এর দশকের শেষদিকে ইংল্যান্ডে অনেক এমন ক্লাবের গোড়াপত্তন হয় যেগুলোতে খেলতেন পাবলিক স্কুলের প্রাক্তন ছাত্ররা। কিনায়ার্ড সমেত ওয়ান্ডারার্সে খেলা এটোনের এককালীন ছাত্ররা চলে যান ওল্ড এটোনিয়ানস ক্লাবে। ওল্ড এটোনিয়ানস দুবার জিতেছিল এফএ কাপ। একবার চার্টারহাউজ স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রদের ক্লাব ওল্ড কার্থুসিয়ানসও এফএ কাপ জেতে। তবে তাড়াতাড়িই ইংল্যান্ডের শিল্পনগরীর ক্লাবগুলো এইসব প্রতিযোগিতায় ছড়ি ঘোরাতে শুরু করে। পাবলিক স্কুলের এলিট অ্যামেচার খেলোয়াড়রা ফুটবলে খানিক কোণঠাসা হয়ে গেছিলেন। ওয়ান্ডারার্স ১৮৮০র দশকের মাঝামাঝি পুরোপুরি উঠেই গেছিল। ফুটবলে পেশাদারিত্বের ধারণা ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছিল। সেটার প্রতিফলন দেখা যায় ১৮৮৮/৮৯ সিজনে খেলা প্রথম ফুটবল লীগ সিজনে।

   প্রথম ফুটবল লিগ টাইটেল জিতেছিল প্রেস্টন নর্থ এন্ড এফসি। ওই দশকের দ্বিতীয় ভাগে তারা ছিল ভয় জাগানো একটা দল। লীগ শুরুর আগের দু'বছরে তারা একটা সময় একটানা ৪২ ম্যাচ অপরাজিত ছিল। সেই উইনিং স্ট্রিক নষ্ট হয় ১৮৮৮ সালের এফএ কাপ ফাইনালে। প্রেস্টন পড়ত সাদা রঙের কিট। তাই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে ফুটতে থাকা ক্লাবের ম্যানেজার সাডেল চেয়েছিলেন খেলা শুরুর আগেই, পরিষ্কার জামায় কাপ সমেত তাদের ছবি যাতে তুলে রাখা হয়। রেফারি সম্মতি দেননি এই বেয়াড়া অনুরোধে। সারা ম্যাচ প্রেস্টন ডমিনেট করলেও এক গোলে ওয়েস্ট ব্রমউইচ অ্যালবিয়ন হারায় তাদের।

  ১৮৮৮/৮৯ সিজনে অবশ্য তেমন ভুলচুক আর করেনি তারা। বাইশটা ম্যাচের আঠেরোটা জিতে, চারটে ড্র করে অপরাজেয় লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় প্রেস্টন। সেবার এফএ কাপ জিতে ডাবলও সম্পন্ন করে তারা। সেখানেও সব ম্যাচ একবারেই জিতে যায় প্রেস্টন। দরকার পড়েনি একটিও রিপ্লের। দুঃখের বিষয় অবশ্য একটাই, সেই প্রথম লিগ সিজনে বিজয়ীদের কোনও ট্রফি দেওয়া হয়নি। কাজেই খালি হাতেই লীগ জয়ের আনন্দে মাততে হয়েছিল তাদের। তবে পরেরবার ফের লিগ জেতে তারা।অবশ্য আগের সিজনের মত ১১ পয়েন্টের লিড নিয়ে নয়, সামান্য দুই পয়েন্টের ফারাকে। এবার তারা জিতেছিল পনেরোটা আর হেরেছিল চারটে ম্যাচ। এর প্রায় পাঁচ দশক বাদে একটি এফএ কাপ বাদ দিলে আর কখনোই কিছু জেতা হয়ে ওঠেনি প্রেস্টনের। ছয়ের দশকের আগে অব্দি মোটামুটি ওপরের দুটো ডিভিশনে ঘোরাফেরা করলেও, বিংশ শতকের শেষ চারটে দশকে তাদের তৃতীয় এমনকি চতুর্থ ডিভিশনেও খেলতে দেখা গেছে। একুশ শতকে অবশ্য দ্বিতীয় ডিভিশনেই তারা খেলেছে হাতে গোনা কয়েকটা সিজন বাদে। প্রেস্টনেই গোটা খেলোয়াড়ি জীবন কাটানো ক্লাব-কিংবদন্তি টম ফিনির অবসরের পরে বাষট্টি বছর আগে টপ ফ্লাইট থেকে রেলিগেশন হয় প্রেস্টনের। তারপর থেকে আর প্রথম ডিভিশনে দেখা মেলেনি ইংল্যান্ডের আদি চ্যাম্পিয়নের। ইংলিশ ফুটবলের দ্বিতীয় ডিভিশনে ২০২৩/২৪ সিজনে তারা এখনও পর্যন্ত ওপর দিকেই আছে। তবে ফুটবল পণ্ডিতেরা তেমন বাজি ধরছেন না এই সিজনের শেষে প্রেস্টনের প্রত্যাবর্তনের ওপর। 

   এইসব ক্লাবের গল্পে অনেক কিছুই স্পষ্ট। ফুটবল খেলাটা যে ফর্মালাইজড হতে বেশ সময় লেগেছে, তা ভালই বোঝা যায়। এখনকার ফুটবলের মত সাফল্যই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার চাবিকাঠি ছিল না তখন। খুব সফল সব ক্লাবও অচিরেই মিলিয়ে গেছে সে যুগের ফুটবল মানচিত্রের থেকে। যেহেতু রেকর্ড রাখার অভ্যেস বা ম্যাচ রিপোর্টিংয়ের রেওয়াজ গড়ে উঠতে সময় লেগেছে, সেহেতু এসব ক্লাবের খেলার গল্পগুলোর মধ্যে পাওয়া যায় কেমন যেন কল্পরাজ্যের ছোঁয়াচ। তাই তাদের ইতিহাস উদঘাটন করার মজাটাও বেশ উপভোগ্য।