(অ্যান ওড টু দ্য ফ্যিউড)
পরিবর্তন ছাড়া আর কিছুই অপরিবর্তনীয় নয়। ফুটবলও এর ব্যতিক্রম নয়। আজ, এই একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের গোড়ার দিকে দাঁড়িয়ে ফুটবলের দিকে তাকালে দেখতে পাওয়া যাবে ইতিহাসের চাকা ঘুরছে। কিছু পুরোনো কথা নতুন দেহ ধরে ফুটবলে এসে জাঁকিয়ে বসছে। ব্রাজিল টিমের কোচ ফের্নান্দো দিনিজ(কেয়ার টেকার কোচ) অন্তত তাই মনে করছেন। তিনি, যাঁর ফুটবল মহলে ডাকনাম, 'কনমেবলের গুয়ার্দিওয়ালা', তিনি ফিরিয়ে আনছেন লুপ্তপ্রায় 'সাম্বা' ফুটবলিং স্টাইল। ইউরোপে এর নাম হয়েছে Relationalism; খেলোয়াড়দের নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক এমন মজবুত করে দাও যেন তাদের প্রত্যেকের মনে হয় এগারোটা আমি খেলছি মাঠে। তথাকথিত 4-4-3 দিয়ে খেলা শুরু করলেও, টিম কোনোরকম কোনো বেসিক ফর্মেশন মানবে না। মাঠের একটা দিক ওভারলোড করে দাও, অপরদিকে দুজন বা তিনজন থাকুক কাউন্টার অ্যাটাকের জন্য। লণ্ডভণ্ড হয়ে যাক সমস্ত ক্যালকুলেশন। এমন একটা অন্তত খেলোয়াড় থাকুক, যে ক্রিয়েটিভলি উন্নত, যেমন নেইমার জুনিয়ার। সে তৈরি করবে অগণিত চান্স, যা উল্টে দেবে সমস্ত লেখাজোকা। সূক্ষ্ম কিছু টাচ, কিছু ফিজিক্যাল সাপোর্ট, এই দুইয়ের অদ্ভুত একটা মিশ্রণ। বিশেষজ্ঞদের মতে এই প্রথাই এগিয়ে নিয়ে যাবে ফুটবলকে আগামী দশকে, আরও নতুনত্বের বিরামহীন খোঁজে, দর্শকদের তুষ্টিতে।
সালটা 1992, বার্সেলোনা নিজেকে খুঁজে পেল ফুটবলে ইতিহাস তৈরী করা ম্যানেজারের হাত ধরে, ইয়োহান ক্রুয়েফ। ফুটবলিং ফিলশফি তৈরী হল বার্সেলোনার। পেপ গুয়ার্দিওয়ালার কথায়, "take the ball, pass the ball, take the ball, pass the ball", বার্সা প্রথমবারের জন্য ইউরোপ জিতল। গোটা পৃথিবী দেখল, খেলোয়াড় গুয়ার্দিওয়ালা ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল কোচিং স্টাফের একজনকে, তিনি দোভাষীর কাজ করতেন, জোসে মোরিনহো। তারপর বছর ষোলো পেরিয়ে গেছে। পেপ রিটায়ার করেছেন, জোসে, যাঁর সম্পর্কে সকলে বলতেন, "he was anything but just a translator", নিজের দেশের ক্লাব পোর্তোকে প্রায় স্বপ্নের দৌড়ে ইউরোপ জিতিয়েছেন। ওল্ড ট্রাফোর্ডের সাইড লাইন ধরে তাঁর ছুট বিজয়ীর, বিশ্বাসীর, হয়ত দাম্ভিকেরও, কিন্তু সেটা তিনি অর্জন করেছেন, তারপর বিখ্যাত ক্লাব চেলসিতে কোচিং করিয়েছেন, এনে দিয়েছেন দুটো প্রিমিয়ার লিগ। আর গুয়ার্দিওয়ালা, তিনি ফিরে এসেছেন বার্সেলোনায়, তিনি জুনিয়ার দলের কোচ। নিখুঁতভাবে দায়িত্ব সামলেছেন গোটা একটা বছর। মে, 2008, দায়িত্বে থাকা কোচ ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ডকে ছেঁটে ফেলল বার্সা বোর্ড, জোর কদমে চর্চা চলতে লাগল নতুন কোচের নাম নিয়ে। হাজারো জল্পনা, কল্পনা। নাম উঠে এল দুটো। অন্তত যাঁরা বার্সা ফিলশফি বোঝেন। এক, জোসে মোরিনহো আর দুই পেপ গুয়ার্দিওয়ালা। প্রথমজনের ঝুলিতে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা, তিন তিনটে বড় বড় ট্রফি। দ্বিতীয়জনের হাতে শুধু এক বছরের অভিজ্ঞতা, তাও ছোটদের দলে। মিডিয়ার কাছে পরিষ্কার, সকলেই জানেন কোচ হতে চলেছেন মোরিনহো শুধু সময়ের অপেক্ষা। ঘটল অঘটন। বোর্ড নিয়োগ করলেন পেপকে। ক্ষুব্ধ মোরিহনহোর প্রতিক্রিয়া মিলল না বটে, তবে তিনি বুঝিয়েও দিলেন, চলে গেলেন ইতালি, জয়েন করলেন ইন্টার মিলান। পেপ, প্রথমেই দল থেকে ছেঁটে ফেললেন ডেকো এবং রোনাল্ডিনহোকে, দশ নম্বর জার্সি তুলে দিলেন এক বছর একুশের ছেলের হাতে, লিওনেল মেসি। বার্সা ওই বছর ঘটিয়ে ফেলল আরও বড় অঘটন। ছোটো ছোটো পাস, অনন্য ক্ষমতা আর বুদ্ধির ধারে খড়কুটোর মতন উড়ে গেল বাকি সব দলগুলো। একটাই সিজনে মোট ছ'টা ট্রফির জন্য ফাইট করে সমস্ত ইউরোপীয়ান দলগুলো। বার্সা জিতে ফেলল ছ'টা ট্রফিই। হেক্সেট! পেপ কি সর্বকালের সেরা? মেসিই কি তবে আসন্ন সময়ের মারাদোনা? শুরু হল তর্ক। ইউরোপীয় মিডিয়া মেসির বিরুদ্ধে খাড়া করল আর এক যুবাকে। যেমন তারা চিরকাল করে এসেছে("Pele good, Maradona better, George Best"), ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
পরের সিজনে, Sport হেডিং করল, "the volcano errupts" বার্সা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ খেলতে গেল ইতালিতে। কোন দলের বিপক্ষে? ইন্টার মিলান। ঠিক তখনি মিলানে অগ্নুৎপাত! এ হয়ত ঈশ্বরের ইচ্ছেই, বা আগামীর সঙ্কেত। বার্সা হেরে ফিরল ঘরে। ফিরতি ম্যাচ ক্যাম্প ন্যু তে। ঘরের মাঠে বার্সাকে হারিয়ে মাঠে খেলোয়াড়দের সঙ্গে নাচানাচিতে মাতলেন কোচ মোরিনহো। জিতে নিলেন লিগ, কাপ এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। প্রেস কনফারেন্সে বললেন, "I think Pep Guardiola is a fantastic coach, but how they've won it last season, I don't think I would like to have won it that way", রেফারির দিকে তীব্র উঁচিয়ে তুললেন আঙুল। সে বছর ব্যালন ডি অর পেলেন মেসি, পরপর দু'বার। মোরিনহো ফেটে পড়লেন তীব্র বিক্ষোভে আর প্রতিবাদে। বার্সার কাছে ততদিনে উনি আর খলনায়ক দুটো সমার্থক শব্দ। তবে, ঈশ্বর জানতেন যে এই সবে শুরু। এ এমন এক দ্বন্দ্ব যা বদলে রেখে দেবে আগামী কয়েক দশকের ফুটবল মানচিত্র। পেপ যেখানে সুন্দর আক্রমণাত্মক ফুটবলে বিশ্বাসী, মনে হয় তিনি হয় ছবি আঁকছেন নইলে খুলে বসেছেন নিজের তৈরী ব্যালড, অপর প্রান্তে জোসে অনেক বেশি ফিজিক্যাল, জেতাটাই তাঁর কাছে শেষ কথা, রেজাল্টই এক এবং একমাত্র প্রাপ্তি।
বাইরে এল দুটো বড় রাইভালরি। মেতে উঠল আপামর ফুটবল প্রেমীরা। এইবার কথা বলার মতন কিছু হচ্ছে ফুটবলে। মেসি না রোনাল্ডো? পেপ না মোরিনহো? বার্সেলোনা না রিয়াল মাদ্রিদ? মাদ্রিদ সই করালো নতুন নাম্বার ৯ ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো আর নতুন কোচ জোসে মোরিনহো। বার্সা আর মাদ্রিদ, লড়াইটা শুধুই মাঠে নয়, কাতলান প্রদেশ দীর্ঘকাল নিজেদের স্বাধীনতা চায়, তাদের রাজধানী বার্সেলোনা, আর স্পেন চায় নিজেদের অক্ষুণ্নতা বজায় রাখতে, রাজধানী মাদ্রিদ। সমস্ত অপশক্তি যেন মোরিনহো, আর যা কিছু ভালো, আলোর উৎস যা কিছু তা পেপ। এরপর ইতিহাস দেখল অনেক কিছুই।
চলন্ত ম্যাচে শুয়োরের কাটা মাথা ছোঁড়া, মিডিয়ায় একে অপরকে তুলোধোনা করা, টাকা দিয়ে একে অপরের বদনাম করানো, মাঠে খেলা কম, মারামারি বেশি, একবার এ দল জেতে তো একবার ওরা, ফলস নাইন পজিশনের পুনর্জন্ম, ডিফেন্সিভ মোরিনহো, কার্ড খেয়ে ম্যাচ জেতা, অ্যাটাকিং পেপ, মাদ্রিদকে একবার ছয় একবার পাঁচ গোল দেওয়া। মোরিনহো mind game নিয়ে এলেন ফুটবলে, "there were poisons in our veins, we want to win, we want each others blood." জেরার পিকে বলেছিলেন বহুবছর পর এ প্রসঙ্গে। খারাপ বনাম ভালো। পেপ জিতলেন ঠিকই কিন্তু আর নিতে পারলেন না এই চাপ মানসিকভাবে, contract এক বছর আগেই ছেড়ে দিলেন, "Mourinho unlocked a giant, and now when pep is no longer there, his players become his enemies, he let the giant go towards his own players", ছাপা হলো Mundo Deportivo তে। পেপ এর পর গেলেন জার্মানি। মোরিনহো আবার চেলসিতে। পেপ 2016 তে এলেন Manchester City এ, মোরিনহো Manchester United এ। টিকিটাকাকে নতুন দর্শন দিলেন পেপ, মোরিনহো বেছে নিলেন সেই প্রতিরক্ষা ও প্রতি আক্রমণ, ফুটবলিং দুনিয়া বলল "Park The Bus"। শুরু হল নতুন অধ্যায়। লং বল, আর শারীরিক ও মানসিক চাপের ফুটবলে সর্বেসর্বা হয়ে উঠলেন পেপ, সাত বছরে তাঁর দলের লোয়েস্ট পজিশন 2, আর মোরিনহো হারিয়ে যেতে লাগলেন অতলে, টটেনহ্যাম এলেন ইউনাইটেড থেকে। চাকরি চলে গেল, এলিট ফুটবল ছোটো ক্লাব ধ্বংসের লিগ শুরু করতে চাইছে তার প্রতিবাদে, প্রায়শই জড়িয়ে পড়তে লাগলেন ঝামেলায়, কখনও ম্যানেজমেন্ট, কখনও রেফারি, কখনও খেলোয়াড়দের সঙ্গে। তিনি ফিরে গেলেন ইতালিতে, এ এস রোমাতে, গিয়ে জিতে নিলেন কনফারেন্স লিগ। এদিকে পেপকে কখনও ইউরো অবধিই নামতে হয়নি, তিনি সবসময় এলিট, ঘরেও তুলেছেন অসংখ্য ট্রফি, এলিট ট্রফি। মোরিনহো ঠিক উল্টো, প্রতিবাদী, লড়াকু সৈনিক। এই দুজনের ফুটবলিং ফিলশফি আর ট্যাকটিক্স বদলেছে, ইবল্ভ করেছে বছর বছর পেরিয়ে। বর্তমান ফুটবল এখনও এঁদের ছত্রছায়ায়। পেপ টিকে রয়েছেন, নতুন নতুন প্রতিপক্ষ তাঁর আসতেই থেকেছে, তিনি অবিচল। তাঁর অবদান ফুটবল বদলানোতে বেশি, এ কথা technically ঠিক, কিন্তু লড়াকু মোরিনহোর প্রভাব দেখা যায় সমস্ত ছোটো দলগুলো জুড়ে, যাঁরা যখন তখন ঘটিয়ে দেন অঘটন।
আজ বছর বারো বাদে, কখনও সখনও এঁদের দেখা যায় একত্রে ডিনারে, গল্প
করতে। বৈরিতা ভুলেছেন দুজনেই। বিপ্লবী মোরিনহো এখন অনেকটাই অস্ত সূর্যের মতন
স্তিমিত, নিস্তেজ, অথচ অতুলনীয়
সুন্দর। পেপ চিরকাল চাঁদের মতনই, রাতের আকাশে একা রাজত্ব
করে চলেছেন। তবে ইতিহাস মনে রাখবে এঁদের। ফুটবল কৃতজ্ঞতা জানাবে আমরণ। আর যে সমস্ত
দর্শক শুধু গোল ছাড়া খেলাটাকে আরও একটু বেশি করে দেখতে চান, তাঁরা হয় আফসোস করবেন এঁদের দেখেননি বলে, নয়ত
স্মৃতিচারণ করবেন উজ্জ্বলতর 'দিনগুলির, রাতগুলির'। বয়ে চলবে
প্রথা, বয়ে চলবে ফুটবল, আর সাথে সাথে অনেক নতুন মুখ,
নতুন চিন্তা নতুন নাম। তবু ২০০৯ -২০১১ থেকে
যাবে গোড়ার কথা হয়ে, আনন্দ ভিত হয়ে।
.png)
.png)

.png)
.png)
2 মন্তব্যসমূহ
Khub valo laglo
উত্তরমুছুনধন্যবাদ।
মুছুনNice