ফুটবল                                                                                           ছোটগল্প                    

     আবেশ কুমার দাস

 

    বসেই পড়তে হল তোতনকে। ছুটতে পারতও না আর। বেকায়দায় আছাড় খেয়ে ছড়ে গিয়েছিল হাঁটুর কাছে। জ্বালাও করছিল বেশ জল দিয়ে ধুতে গিয়ে। কিন্তু কাটা ঘায়ে বেশি করে নুন ছিটোচ্ছিল যেন রণেনবাবুর কথাগুলো, খেলাধুলো করেছ কখনও? দৌড়নো দেখলেই বোঝা যায়। দুসপ্তা ধরে নাচছিলে এদিকে মাঠে নামার জন্য। এখনই তো মচকাচ্ছিল গোড়ালিটা। দুদিন শুয়ে থাকতে হত পায়ে চুন-হলুদ মেখে

       ওয়ার্ম-আপ সেরে তখন মাঠে নেমে পড়েছে হীরক। খেলাও শুরু হয়ে গিয়েছে আবার। অতনুর পায়ে বল। পিছুপিছু ছুটছে সৌমেন আর কাশী। বিপদের গন্ধ বুঝে নিজেদের রক্ষণে হুঁশিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে বিপ্র, সৌরভ, ধলারা। ফাঁকা উইং ধরে ওদিকে সবার অলক্ষ্যে উঠে যাচ্ছে ইভান।

      খেলায় আবার ফিরে এসেছে উত্তেজনা। ছড়িয়েছিটিয়ে মাঠের ধারে বসা সক্কলেই আবার বুঁদ হয়ে পড়েছে খেলায়একা তোতনেরই আর মন বসছিল না বকুলতলার মাঠে।

     পশ্চিমে গঙ্গার দিক থেকে বয়ে আসছিল ফুরফুরে হাওয়া। গেমটিচার রণেনবাবুর কথাগুলো সেই হাওয়ায় পাক খেয়ে খেয়ে যেন এসে বাজছিল তোতনের কানে। আর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সেই ছবিগুলো। আপ্পাদার বুকশেলফের ঝকঝকে ইংরেজি বইটার পাতায় পাতায় যাদের দেখা।

               ইস্টার আইল্যান্ডের উঁচু উঁচু সেই পাথুরে মূর্তিগুলো...

               আন্দিজ পর্বতমালার কোলে ইনকাদের মাচুপিচ্চু...

               পার্থেননের সেই ঝাঁক ঝাঁক স্তম্ভ...

      চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল তোতনের। প্রথম দিন মাঠে নেমেই টের পেয়ে গেল সে। বল পায়ে পেলের মতো ম্যাজিক দেখানো তার কম্মো নয়। বরং পাক্কা ম্যাজিশিয়ানের ভঙ্গিতে বকুলতলার মাঠ এখন কাঁপাচ্ছে অতনু। আটকাতে এসে একপাশে ছিটকে পড়ল বিপ্রঅত বড় চেহারার ধলাকেও এদিক-ওদিক করে কেমন কাটিয়ে নিল। সামনে এবার শুধু সৌরভ আর গোলে শুকদেব। বাঁ-পায়ের জুতোয় কি আঠা লাগিয়ে নেমেছে অতনু?

      মঙ্গলবার করে খেলার জন্য ক্লাস সিক্সের শেষ পিরিয়ডটা অফ থাকে ভাটপাড়া অমরকৃষ্ণ পাঠশালায়। সবাইকেই যেতে হয় মাঠে। ক্লাসের চুয়ান্ন জনের প্রত্যেককেই রোজ মাঠে নামানো না গেলেও রণেনবাবু বলেই রেখেছেন মাসে অন্তত একবার দশ মিনিট হলেও খেলাবেন সকলকেই। আজকের দিনটার জন্য মুখিয়ে বসেছিল তোতন। কেবলই মনে হচ্ছিল গতবছর থেকে দেখে আসা স্বপ্নটা তাহলে সত্যি হতে চলেছে এবার। মাঠে নামবে সে-ও। প্রথম দিনেই তাক লাগিয়ে দেবে ক্লাসের সক্কলকে। হাঁ করে ভাববে ইভান, ভাববে সৌরভ, মাথা চুলকোতে চুলকোতে ভাববেন রণেনবাবুও, এত জাদুও লুকিয়ে ছিল এই রোগাটে ছেলেটার পায়ে! কিন্তু এখানেই শেষ নয়। অল্পে মোটেই সন্তুষ্ট হবে না সে। এরপর ইন্টার স্কুলের বড় খেলাতেও জায়গা করে নিতে হবে দলে। জেলা থেকে তারপর রাজ্য। ছবি ছেপে কাগজে কাগজে লেখা হবে তাকে নিয়েও। ফুটবলের দৌলতেই একদিন বিশ্বজোড়া নাম হবে তার। নর্স দেবতাদের নিশীথ সূর্যের দেশ থেকে সূর্যনগরীর রহস্যময় মহাদেশ অবধি বল পায়ে দাপিয়ে বেড়াবে তোতন।

      মাঠ জুড়ে মুহুর্মুহু ঝলসে উঠতে থাকা অতনুকে দেখতে দেখতে মনে পড়ে যাচ্ছিল আপ্পাদার ঘরের গ্লোবটাকে। হাত দিয়ে একপাক ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল আপ্পাদা, এই দ্যাখ, যেখান থেকে সরু হয়ে যাচ্ছে আফ্রিকা মহাদেশ, ওখানেই রয়েছে ক্যামেরুন। রজার মিল্লার দেশ।

               আর হন্ডুরাস?

   এই যে, ফ্রেমে আটকানো গ্লোবটাকে আবার খানিক ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল আপ্পাদা, উত্তর আমেরিকার লেজে। ছোট্ট দেশ। দুদিকের সৈকতে অনবরত আছড়ে পড়ছে দুই মহাসাগরের ঢেউ।

   নিজের হাতে গ্লোবটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিল তোতন। এই তো কাস্পিয়ান সাগর। আসলে হ্রদ। এপার-ওপার দেখা যায় না। অত বড় বলে নাম হয়েছে সাগর। এই সেই ভূমধ্যসাগর। এরই নীল জলের ধারে অলিম্পাস দেবতাদের গ্রিস। আরও উত্তরে এগোলে এই যে ডেনমার্ক। যার সোনালি বেলাভূমি থেকে জলপরিরা হাতছানি দিয়ে ডাকত দূর জাহাজের নাবিকদের।

   ভাগ্যিস শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপটা। চারপাশটা কেমন রঙিন হয়ে উঠল রাতারাতি। গলিতে-গলিতে, পাড়ায়-পাড়ায়, পুরনো বাড়ির ঝুলবারান্দা থেকে ঝুলতে লাগল আকাশি-সাদা নয়তো হলুদ-সবুজ পতাকা। হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় কোথাকার সব দেশের নাম। কোন সাতসমুদ্র আর তেরো নদীর পাড়ে যে ছিল তাদের অস্তিত্ব, এতকাল মাথাই ঘামায়নি কেউ। গদাইকাকুর সেলুনে কতরকম কায়দাতেই না চুল ছেঁটে গেল কত লোকে। শান্টুদার মাথায় ছিল একরাশ চুল। সামনেটায় আধখানা চাঁদের মতো একফালি বাঁচিয়ে রেখে আর সব চেঁছেপুঁছে ফেলে দিয়ে এল একদিন। অন্য সময় হলে নির্ঘাত পাগল ঠাওরাত নয় ঢিল মারত লোকে। বিশ্বকাপের বাজারে অমন উৎকট সাজ আর পিঠে ইংরেজিতেদশলেখা একখানা হলদে জার্সি চাপিয়েই বুক ফুলিয়ে ঘুরতে লাগল শান্টুদা। কমবয়সিরা তাকাতে লাগল সমীহর চোখে। কী কথায় সেদিন ডাঁটসে হেঁকে দিল লাট্টুদাকে, চুপ কর, তোরা তো বরাবরের জার্মান পার্টি। ভোল বদলে এখন আর্জেন্টিনা সাজলেই হবে?

   দোকানে-বাজারে, রোয়াকের আড্ডায় আচমকা থেমে গেল বড়দের একঘেয়ে আলোচনাগুলো। সেই দুঘণ্টার বৃষ্টিতে কলকাতার পথেঘাটে জল দাঁড়িয়ে যাওয়া, খাসির মাংসর কিলোতে শো ছুঁতে চলা থেকে ফি সন্ধ্যায় পনেরো মিনিট দেরি করে শিয়ালদা থেকে ট্রেন ছাড়ার ঘটনাগুলো কোথায় ভেসে গেল। সবার মুখেই খালি ফুটবল। সেলুনে গিয়ে একদিন স্বপনকাকুকে বলতে শুনল তোতন, বাঙালির যেমনি দুর্গাপুজো, সারা পৃথিবীর তেমনি বিশ্বকাপ ফুটবল। তাও তো বছর বছর ঘুরে আসে দুর্গাপুজো...

   দুয়ের পাতার কমিকসটার জন্যই এতদিন সকালে খবরের কাগজটার অপেক্ষায় থেকেছে তোতন। বাদবাকি পুরো কাগজটাই তো ওই বড়দেরই জন্য। ইদানীং আগের রাতের বাছা বাছা খেলাগুলোর কথাও একেবারে প্রথম পাতাতেই লিখতে লাগল ফলাও করে। কিছুদিন পর থেকে কমিকসের পাশাপাশি ফুটবলের খবরগুলোও বেশ আগ্রহ নিয়ে পড়তে লাগল তোতন।

   ঘানা নামে কালো মানুষদের একটা দেশ আছে আফ্রিকার কোথাও। পুসকাস নামে সেকালের এক মারকাটারি খেলোয়াড় ১৯৫৪- বিশ্বকাপ প্রায় জিতিয়েই দিয়েছিলেন স্বদেশ হাঙ্গেরিকে। উরুগুয়ের মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপের আসর বসেছিল সেই কবে ১৯৩০ সালে। কাগজ থেকে প্রতিদিনই চোখে পড়তে লাগল এমন নিত্যনতুন গল্প। কোন তেপান্তরের পাড়ে আছে এসব রূপকথার দেশের ঠিকানা? সেদেশের মানুষ কি দিনরাত শুধুই ফুটবল খেলে বেড়ায়? এমন আশ্চর্য দেশগুলোর কথা লেখেও না ভূগোল বইতে!

   কত বড় দেশ আর্জেন্টিনা? যেখানকার গলিতে জন্ম হয়েছিল মারাদোনা নামের সেই কোঁকড়ানো চুলের রাজপুত্রের! সেখানেও কি আছে ভাটপাড়ার মতো পুরনো পুরনো বাড়ি? গলিতে গলিতে আছে এমন গোল গোল জলের ট্যাঙ্ক? বড়রাস্তা দিয়ে গাঁকগাঁকিয়ে ছুটে যায় পঁচাশি নম্বর বাসেরা? ঝুপঝুপে বৃষ্টির দিনে কি অমনই পিছল হয়ে থাকে পুরনো বাড়ির শ্যাওলাধরা উঠোন? টিপটিপে বর্ষার রাতে দুর্গের মতো ঘোরানো সিঁড়ির বাঁক থেকে কি অমনই ছ্যাঁত করে সরে যায় বর্ষাতি-আঁটা ছায়ারা? মেঘ কেটে যাওয়া রাতের আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকালে কালপুরুষের বকলসটাকে কি অবিকল অমনই দেখায় আর্জেন্টিনার আকাশেও?

   শুধু কি এসব অজানা দেশ আর তার অদ্ভুত লোকজন? দু’-একদিন রাতে বাপির সঙ্গে টিভির সামনে বসে আরও কত কী খেয়াল করেছে তোতন। অশোক চক্রটাকে সরিয়ে ভারতের পতাকাটা আড়াআড়ি ঘুরিয়ে দিলেই বেমালুম হয়ে যাবে আইভরি কস্টের পতাকা। সুমনের ডাক্তার জেঠুর গাড়ির কাচে আঁকা আছে একটা লাল যোগচিহ্ন। টকটকে লাল শালুর গায়ে একটা অমন সাদা চিহ্ন এঁকে দিলেই হয়ে যাবে অবিকল সুইজারল্যান্ডের পতাকা। না না, সুইৎজারল্যান্ড। আপ্পাদা বলেছে, অমনই হবে আসলে উচ্চারণটা।

   আচ্ছা, কী ভাষায় কথা বলে আর্জেন্টিনার মানুষ? কে জানত এই নিরীহ প্রশ্নটার সূত্রেই জানা হয়ে যাবে আরও কত আশ্চর্য গল্প! আপ্পাদার কথায় অবাক হয়ে গ্লোবটার দিকে তাকিয়েছিল তোতন। পৃথিবীর বেশিটাই জল। মাঝেমধ্যে স্রেফ দ্বীপের মতো জেগে রয়েছে দেশ-মহাদেশগুলো। কত হাজার মাইল চওড়া সেই আটলান্টিক মহাসাগরের অবিরাম জল আর অন্তহীন দূরত্ব পেরিয়ে পশ্চিম ইউরোপের দুই প্রতিবেশী পর্তুগাল স্পেনের মানুষের মুখের ভাষা কীকরে কথ্যভাষা হয়ে উঠল ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার লোকজনের?

   তোতনের প্রশ্নে হাসে আপ্পাদা। গ্লোবটার গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে বলে, কী জানিস! এতদিন যে প্রশ্নগুলো করছিলিস তুই, তার জবাব ছিল এই ছোট্ট পৃথিবীটার গায়েই আঁকা। যেহেতু প্রশ্নগুলো ছিল ভূগোলের। কিন্তু এই ভূগোলটাকে চিনতে চিনতেই যে প্রশ্নটা করে ফেললি আজ, তার জবাব তো এত সাদাচোখে আর খুঁজে পাবি না। জবাবটা যে লুকিয়ে আছে ইতিহাসে...

বিলুপ্ত ইনকা সভ্যতার গল্প বলে যায় আপ্পাদা। যার চোখ-ধাঁধানো ঐশ্বর্য জন্ম দিয়েছিল সূর্যনগরীর কিংবদন্তির। আপাদমস্তক সোনায় মোড়া সেই শহরের খোঁজে দক্ষিণ আমেরিকায় আনাগোনা জমে দুর্ধর্ষ স্পেনীয় লুটেরাদেরছলনায় বন্দি করে ইনকা সম্রাট আটাহুয়াপ্পাকে হত্যা করে লুটেরার দল। স্পেনীয়দের পিছুপিছুই আসে পর্তুগিজ লুটেরারা। ক্রমে গোটা দক্ষিণ আমেরিকাই পরিণত হয় স্পেনীয় পর্তুগিজদের উপনিবেশে। বিদেশি বিজেতার আগ্রাসনে পিছু হটতে শুরু করে ভূমিপুত্রদের নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি। খোদ ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা থেকেই কালক্রমে হারিয়ে যায় টুপি-গুয়ারানি ভাষা। প্যারাগুয়ে বা বলিভিয়ার কিছু উপজাতির মুখে হয়তো কোনওমতে আজ বেঁচেবর্তে রয়েছে সেই সাবেক ভাষা।

কতকিছুই হারিয়ে যায় কতভাবে। আবার এক্কেবারে হারিয়ে না গিয়ে আধুনিক সংস্কৃতিতেও মিশে যায় অনেক পুরনো সংস্কার। নরওয়ের পুরাণের গল্প বলে আপ্পাদা। আমাদের ইন্দ্রের মতোই নর্স পুরাণে দেবরাজ মানা হত ওডিনকে। এক চোখ কানা দেবতা। আপ্পাদা বলে, সপ্তার সাতটা দিনের নাম কিন্তু এই নর্স দেবতাদের নাম থেকেই এসেছে।

কেমন?

ওডিনের নাম থেকে ওডিনস ডে বা ওয়েডনেসডে। বুধবার দিনটা নর্স মতে ওডিনের দিন। তেমন ওডিনের ছেলে টিউয়ের নাম থেকে টিউইস ডে বা টুইসডে। আর-এক ছেলে থরের নাম থেকে থরস ডে বা থারসডে। মেয়ে ফ্রেয়ার নাম থেকে ফ্রেয়াস ডে বা ফ্রাইডে।

আর শনি, রবি আর সোমবার?

একইভাবে স্যাটার্নস ডে থেকে স্যাটারডে। সানস ডে থেকে সানডে। মুনস ডে থেকে মানডে। আমাদের পুরাণে সোম কোন দেবতার নাম জানিস?

না। কার?

চাঁদের। চন্দ্রদেবকে সোমদেব বলা হত। নর্স পুরাণেও সোমবারটাকে চাঁদের দিনই বলা হচ্ছে।

আশ্চর্য তো!

সত্যিই আশ্চর্য। কোথায় ভারত আর কোথায় নরওয়ে! এত দূরের দুটো দেশ! অথচ দুজনের পুরাণের গল্পে কী অদ্ভুত মিল! আরও আছে।

তাই নাকি, মন্ত্রমুগ্ধের মতো জিজ্ঞাসা করে তোতন, আর কী মিল?

আমাদের পুরাণে একজন বদখত দেবতার নাম আছে। কলি। রাজা নলকে যে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছিল। মজার কথা, নরওয়ের পুরাণেও অমন এক দেবতার নাম পাওয়া যায়। লোকি।

   কথা সরছিল না আর তোতনের মুখে। গ্লোবটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আস্ত পৃথিবীটাকেই একটা জীবন্ত বিস্ময় মনে হচ্ছিল। যেন চারপাশের দেখা, রোজের দেখা, পঁচাশি নম্বর বাসরাস্তার ধারে দেখা রংচটা পৃথিবীটার অন্তঃসারেই রয়েছে অতলান্ত মুগ্ধতার আর-একটা পৃথিবী। স্কুলের একঘেয়ে ইতিহাস আর ভূগোলের বই মুখস্থ করতে করতে, দূরত্ব আর গতিবেগের অঙ্ক করে পরপর ক্লাসে উঠতে উঠতে কিছুতেই খোঁজ মেলে না যার। মায়া সভ্যতার মায়া থেকে আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘরের ফ্যাকাসে আলোর জগতে খুঁজে পাওয়া যাবে যার অস্তিত্বকে। বিশ্বকাপের খেলাগুলো শুরু না হলে টেরই পাওয়া হত না কখনও সেই অন্য পৃথিবীটুকুর বাস্তবতা।

   ভাবতে ভাবতে আচমকা আপ্পাদার টেবিলে বসানো গ্লোবটাতেই যেন মাঠের সবুজ ঘাসে অবিরাম গড়াগড়ি খাওয়া ফুটবলের আদলটাকে টের পেল তোতনসত্যি তো, সেই কবে থেকে সূর্যকে বেষ্টন করে অনর্গল পাক খেয়ে আসা পৃথিবীটারও কোনও বিরাম নেই, কোনও বিশ্রাম নেই। যত সাংঘাতিক ধূমকেতুই ধেয়ে আসুক তার দিকে, যত ভারী উল্কাই খসে পড়ুক তাকে নিশানা করে, এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ানোর জো নেই পৃথিবীটার। ফুটবলের মতোই রোদেজলে পুড়েভিজে অবিশ্রান্ত ছুটে চলতে হবে তাকেও।

   সেদিনই মনস্থির করে ফেলেছিল তোতন। বড় হয়ে ফুটবলই খেলবে সে। পৃথিবীর সবথেকে বড় উৎসব ফুটবলের বিশ্বকাপ। রাতের পর রাত জেগে খেলা দেখতে বসে থাকে কত মানুষ। পেলে থেকে মারাদোনা, মেসি থেকে রোনাল্ডোফুটবলের রাজপুত্রদের একডাকে চেনে গোটা পৃথিবী। ফুটবলের আকারের এই পৃথিবীটার রাজা হতে গেলে পায়ে বল নিয়েই দৌড়তে হবে অমন অবিরাম। নরওয়ে থেকে অস্ট্রেলিয়া, ক্যামেরুন থেকে উরুগুয়েছুট, ছুট, ছুটে চলতে হবে কত পথ। তবেই কিনা একদিন দেখা হবে অতলান্ত মুগ্ধতার সেই অন্য পৃথিবীটার সঙ্গে।

   সিক্সে ওঠার পর সপ্তাহের রুটিনে মঙ্গলবারের খেলার পিরিয়ডটাকে থাকতে দেখে তাই হাতে যেন চাঁদ পেয়েছিল তোতন। বকুলতলার মাঠে প্রথম দিন পা দিয়ে থেকে লেগেছিল রণেনবাবুর পেছনে। প্রথম দুদিন বদলি হিসেবেও তাকে মাঠে নামাননি স্যার। কে আর বুঝবে মাঠের ধারে বসে বসে বন্ধুদের খেলতে দেখা কী বিরক্তির! বিশেষ করে যাকে নিজেকে একদিন বড় ফুটবলার হতে হবে তার পক্ষে। আজ সুযোগ হয়েছিল একেবারে শুরু থেকেই নামার। হাঁটুর ক্ষতর জায়গায় আটকানো ব্যান্ডেডটায় হাত বুলোতে বুলোতে মনে হচ্ছিল তোতনেরমাঠে এলেই স্যারের সঙ্গে থাকা লাল ওষুধ, তুলো, ব্যান্ডেজের সরঞ্জামগুলো প্রথম কাজে লাগল কিনা তারই জন্য!

একটা প্রবল হল্লায় মুখ তুলে দেখল তোতন, শুকদেবকে কাটিয়ে গোলটা দিয়েই ফেলেছে অতনু।

পাক খেতে খেতে গোলপোস্টের পেছন দিয়ে মাঠের বাইরে চলে যাচ্ছে ফুটবলটা

     বুধবারের প্রথম ক্লাসটা থাকে ভূগোলের। এমন গোলমেলে প্রশ্নটা যে আজকেই উঠে পড়বে কে জানত! নতুন চ্যাপটার শুরুর আগে কিছু গল্প বলা বা বেকায়দার একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া বরাবরের অভ্যাস রাজীববাবুর। স্বভাবতই গল্পগুলো হয় সবার অজানাপ্রশ্নের জবাবও থাকে না ক্লাসের কারও কাছেই। নিজেই তারপর উত্তর দিয়ে, পুরো বিষয়টাকে গল্পের ছলে বুঝিয়ে দিয়ে নতুন চ্যাপটারে ঢুকে পড়েন স্যার। ফাইভ থেকেই সবাই দেখছে স্যারের পড়ানোর এই অদ্ভুত কায়দাএবং এই কারণেই আরও ভাল লাগে রাজীববাবুর ক্লাস। কিন্তু স্যারের আজকের প্রশ্নটা ছিল একেবারেই সোজাসাপটা। ক্লাসের প্রত্যেকটা ছেলের কাছেই থাকবে জবাব

     রোলকলের পালা মিটিয়ে প্লাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে গোটা ক্লাসের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন রাজীবস্যার, বলতে পারবে তোমরা, পৃথিবীর আকৃতি ঠিক কেমন?

               ফুটবলের মতো স্যার...

               একা তোতন বাদে চেঁচিয়ে উঠল বোধহয় গোটা ক্লাসটাই।

        হাত তুলে সকলকে থামতে ইশারা করে বলতে শুরু করলেন স্যার, এককথায় হবে না এই উত্তর। অনেককাল আগে মানুষ মনে করত তারা যেমন দেখছে পৃথিবীটা বুঝি আগাগোড়া অমনই সমতল। ম্যাগেলানের সমুদ্রযাত্রার পর ভাঙল সেই ভুল। বোঝা গেল পৃথিবীটা আসলে গোলাকৃতি। তখনকার মানুষ এই তোমাদের মতোই ভেবেছিল পৃথিবীটা আসলে ফুটবলের মতো নিটোল গোল। তারপর যখন অনেক উন্নত হল বিজ্ঞান, আধুনিক মাপজোখ শুরু করলেন বিজ্ঞানীরা, তাঁদের চোখে পড়ল অবিরাম ঘোরার ফলে আর ঠিক নিখুঁত ফুটবলের মতো নেই পৃথিবীটা। পেটের কাছটা, মানে নিরক্ষীয় অঞ্চল হয়ে গেছে খানিক চওড়া আর দুই মেরু হয়ে গেছে খানিক চাপা। তখন আবার বলা হতে লাগল, পৃথিবীর আকৃতি কমলালেবুর মতো। সেই মতো আবার নতুন করে লেখা হল বইপত্র। কিন্তু আরও পরে বিজ্ঞানীরা খেয়াল করেছেন, ঠিক কমলালেবুও যেন নয় আমাদের এই গ্রহটা। উত্তর মেরু যত চ্যাপটা দক্ষিণ মেরু একেবারে অবিকল তত চ্যাপটা নয়। কিছুটা হেরফের আছে দুই মেরুতে। আজকাল তাই বলা হচ্ছে, আমাদের পরিচিত কোনও পার্থিব বস্তুর আকারের সঙ্গেই ঠিকঠাক মেলে না পৃথিবীর আকার। তাই আজ থেকে আমরা বলব, কোনও অন্যকিছুর সঙ্গে আর তুলনা নয়, পৃথিবীর আকৃতি আসলে পৃথিবীর মতোই। তোমাদের নতুন চ্যাপটারে যা পড়া হবে...

               আচমকা চোখ তুলে তাকিয়েছে তোতন। সব মেঘ কেটে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তার চোখমুখ। খুব ভাল লাগছে স্যারের কথা শুনতে।

               সেই অন্য পৃথিবীটার নতুন আলো দেখতে পেয়েছে সে।

               রাজীবস্যারের কথায় এখনই যেহেতু জানল, ফুটবল নয়, পৃথিবীর আকৃতিটা আসলে পৃথিবীর মতোই

            

                                           

                                                  (সায়ন্তনী, শারদ ১৪২৭)