পাখির চোখঃ শান্তি মল্লিক                                                     ফিচার 

সৌরাংশু

  সাম্প্রতিককালে ভারতীয় মহিলা ফুটবলের সবথেকে পরিচিত মুখ মণিপুরের ওইনাম বেমবেম দেবী, যাঁকে ভারতীয় ফুটবলের দেবী দুর্গা বলা হত ২০১৭ সালে তিনি অর্জুন পুরস্কার পান, মহিলা ফুটবলার হিসাবে দ্বিতীয় তাহলে প্রথম কে! কবে! ১৯৮৩, শান্তি মল্লিক সে এক সম্পূর্ণ অন্য সময় ভারত তখন অন্ততঃ এশীয় স্তরে মহিলাদের ফুটবলে যথেষ্ট পরিচিত নাম

  এসব কিছু শুরু হয়েছিল ৭৫ সালে প্রায় একই সঙ্গে বাংলার মহিলা ক্রিকেট আর ফুটবল দল তৈরি হচ্ছে রবীন্দ্র সরোবরে তখন অভীক ব্যানার্জীর ক্লাব পায়োনিয়ার স্পোর্টিং অ্যাসোসিয়েশনে হ্যান্ডবল খেলতে যান শান্তি মা-বাবার আস্কারায় আর বাড়ির বাকিদের রক্তচক্ষু পেরিয়ে বাবা হরেকৃষ্ণ মল্লিক দক্ষিণ কলকাতায় বেশ পরিচিত ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন 

তা তখন বাংলা ফুটবল দলের জন্য ট্রায়াল হবে কোচ সুশীল ভট্টাচার্য শান্তি ছটফটে ছিলেন, গতিশীল বল নিয়ে বেশ ছুটতে পারতেন দু পায়ে গোলার মতো শট অবশ্য ঘষামাজা করে তৈরি করেন সুশীলবাবু সেই শুরু বাংলার হয়ে ফুটবল খেলতে খেলতে ভারতীয় দল তখন মহিলা ফুটবল ফেডারেশন মেয়েদের ফুটবলটা দেখাশুনো করত টাকাপয়সা একেবারেই ছিল না মেয়েদের ফুটবলে আর ১৯৮১ পর্যন্ত মাত্র ৬০ মিনিট করে মেয়েদের ফুটবল খেলা হত অবশ্য কোলকাতা লিগও খেলা হত মাত্র ৭০ মিনিটের

  ৭৫ থেকেই বাংলা দলে সুযোগ পেয়ে গেলেন শান্তি সঙ্গে কুন্তলা ঘোষ দস্তিদার, শুক্লা দত্ত, মিনতি রায়, নীলি ঘোষ প্রমুখ প্রখ্যাত ফুটবলার এবং কোচ প্রদীপ ব্যানার্জির স্ত্রী আরতি ব্যানার্জি তখন বাংলায় ফুটবল এবং ক্রিকেট উভয়েরই ফেডারেশন শুরু করেছেন শান্তিরা যখন লক্ষ্ণৌ গেলেন তখন তাঁদের বুট পরে ফুটবল খেলারও অভ্যাস নেই সে বছর কেউই বুট পরে খেলেননি

  তবে বাংলার মহিলা ফুটবলের কথা হলে আরেকজনের নাম অবশ্যই চলে আসে, এবং তাঁর নাম কালীঘাট ক্লাবের নতু কোলে বা এন সি কোলে কোলে বিস্কুট বা কোলে মার্কেটের মালিক, যিনি খেলাটা ভালোবাসতেন এবং তাতে বিনিয়োগ করতে দরাজ হাতে এগিয়ে আসতেন আসলে তখন ময়দানে নিবেদিত প্রাণ কর্মকর্তাদের দেখা পাওয়া যেত এন সি কোলে নিশ্চিত করতেন যে প্র্যাকটিসের পর বাংলা দলের মেয়েরা যেন ভাল করে পুষ্টিকর খাবার খেতে পান দুটো করে ডিম, কলা, বা অন্য কিছু ফল গায়ে জোর না এলে, স্ট্যামিনা না এলে মেয়েরা খেলবে কীভাবে

   ১৯৭৫ -এর প্রথম জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলা বিদর্ভকে ফাইনালে ২-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় নীলি ঘোষের অধিনায়কত্বে দলে ছিলেন জুডি ডিসিল্ভা, মায়া দাস, রমা দাস, আলো চক্রবর্তী, মিনতি রায়, শুক্লা দত্ত, কুন্তলা ঘোষ দস্তিদার, দীপ্তি মল্লিক, চন্দনা মুখার্জি, চন্দ্রিমা সরকার, কবিতা ঘোষ, রসনা সুতারিনা এবং অবশ্যই শান্তি মল্লিক, ফাইনালে গোল দুটির একটি করেন তিনি অপরটি দীপ্তি মল্লিক

এভাবেই সুযোগ চলে আসে ভারতের হয়ে থাইল্যান্ডের একটি দল ১৯৭৬এ খেলতে আসে ভারতে বিদেশি দল হিসাবে এই সময় প্রথম তাদের বিরুদ্ধে খেলার জন্য নির্বাচিত হন শান্তি অবশ্য থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে বেশ কিছু ম্যাচে ভারতের অধিনায়ক ছিলেন তখনকার ভারতীয় অধিনায়ক নীলি ঘোষ এমন কি ব্যাঙ্গালোরের দ্বিতীয় ম্যাচে ভারতের হয়ে প্রথম গোলও করেন নীলি

   এখান থেকেই শুরু, তারপরের বছর সুইডেনের দল এল ভারতে খেলতে এই সময়ই আরতী ব্যানার্জির ভারতীয় মহিলা ফুটবল ফেডারেশন এশিয়ান মহিলা ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে আলোচনা করে এশিয়া কাপকে দেশে নিয়ে এলেন ১৯৮০র এশিয়া কাপ খেলা হচ্ছে কোড়িকোড়ে অধিনায়ক, গোলকিপার চিত্রা গঙ্গাধরণ কিন্তু স্টার হচ্ছেন শান্তি লেফট ইন পজিশনে শান্তি, স্ট্রাইকার হিসাবে শুক্লা দত্ত এবং সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে কুন্তলা ঘোষ দস্তিদার এই তিনজনই দলের নিউক্লিয়াস সে বছর অবশ্য ভারতের দুটো দল খেলছে ইন্ডিয়া এস এবং ইন্ডিয়া এন বলা বাহুল্য, প্রথম দলটি ইন্ডিয়া এস আসলে তখন এশিয়ায় মহিলা ফুটবল না ফিফা, না এএফসি কেউই পরিচালনা করে না বলে প্রত্যেকবারই  আয়োজক দল ছাড়া প্রায় প্রত্যেককেই ফিফা এবং এএফসি নিরুৎসাহিত করত  ১৯৮০র এশিয়া কাপে চিন, ভারত, মালয়েশিয়া এবং হংকং ছাড়া আমন্ত্রিত হয়েছে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার দল প্রথম ম্যাচেই যাদের পরিষ্কার গোলে হারায় ভারত শান্তি এবং শুক্লা দত্ত গোল করেন এরপর চিন মালয়েশিয়ার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে ভারত আর ইন্ডিয়া এন এবং হংকংকে হারায়

   সেমিফাইনালে আবার শুক্লা দত্ত, সুষমা দাস এবং ইওলন্ডা ডিসুজার করা গোলে হংকংকে -১এ হারায় মজার কথা হল, আগে থেকে টিকিট কাঠা থাকায় তৃতীয় স্থানের জন্য পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ম্যাচটি হংকং খেলতে পারেনি ২০শে জানুয়ারি ১৯৮০, ফাইনালে চিনের বিরুদ্ধে দারুণ খেলেও অভিজ্ঞতার অভাবে - হার হয়

  ১৯৮১তে অধিনায়ক কুন্তলা ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে ভারতীয় দল খেলতে যায় তাইওয়ানে, উইমেনস ওয়র্ল্ড ইনভিটেশনাল টুর্নামেন্টে ১৪টি দলের মধ্যে হাইতি, ভারত, তাইওয়ানের দুটি দল, ফিলিপাইন্স, নিউজিল্যান্ড থাইল্যান্ড, মোট ৭টি জাতীয় দল এবং জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ইউএসএ, ফিনল্যান্ড ফ্রান্সের ৭টি ক্লাব দল ছিল ভারতীয় দলে বাংলার হয়ে খেলছেন শুক্লা নাগ, রমা দাস, সুষমা দাস, মিনতি রায়, জুডি ডিসিল্ভা, শুক্লা দত্ত, ইন্দ্রাণী সাহা, চৈতালি চ্যাটার্জি এবং শান্তি মল্লিক চৈতালি চ্যাটার্জি ফিফা রেফারি এবং কলকাতার প্রথম মহিলা বাস ড্রাইভারও বটে

  এই টুর্নামেন্টে জয়ের মুখ না দেখলেও হাইতি এবং চ্যাম্পিয়ন তদানীন্তন পশ্চিম জার্মানির ক্লাব এসএসজি ব্যারগিস গ্লাডবাখের সঙ্গেও গোলশূন্য ড্র রাখেন শান্তি, কুন্তলারা

   পরের বছর হংকং-এ এশিয়া কাপে শান্তি নিজেই অধিনায়ক শুক্লা দত্ত এবং সোকোরিনা পেরেরার সঙ্গে বোঝাপড়া আরও ভালো হয়েছে সিঙ্গাপুরের বিরুদ্ধে শান্তি একাই করেন ৪টি গোল, ভারত জেতে - ফিলিপাইন্সের বিরুদ্ধে - জয়ে শুক্লা দত্ত ৪টি গোল করলেন এবং শান্তি মল্লিক ২টি কিন্তু সেমিফাইনালে থাইল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচে ন্যূনতম ব্যবধানে - হার হল যদিও আয়োজক হংকংকে - গোলে হারিয়ে তৃতীয় স্থান জোটে

   তবে শান্তি মল্লিকের সেরা পারফরম্যান্স তারপরের টুর্নামেন্টে তারপরের এশিয়া কাপ এক বছর পরে ১৯৮৩তে, থাইল্যান্ডের ব্যাংককে গ্রুপ লিগের ৫টি ম্যাচে শান্তি মল্লিক ৮টি গোল করলেন থাইল্যান্ডের কাছে মাত্র একটি ম্যাচ হেরে ভারত দ্বিতীয় হিসাবে শেষ করল গ্রুপ স্টেজ ফাইনালে আবার থাইল্যান্ড ঘরের মাটিতে থাইল্যান্ড ভারতকে নাস্তানাবুদ করে - হারাল সমস্যাটা অবশ্য স্ট্যামিনার ছিল ৬০ মিনিট সমানে সমানে লড়ার পর দশ মিনিটে স্রেফ দমে টান পড়ায় গোল খায় ভারত এবারও রানার্স

  তবে এশিয়ান অলস্টার দলে কুন্তলা ঘোষ দস্তিদার এবং শুক্লা দত্তের সঙ্গে শান্তি মল্লিকেরও সুযোগ হয় আর প্রথম ভারতীয় মহিলা ফুটবলার হিসাবে অর্জুন প্রাপ্তিও ১৯৮৩তেই

  কিন্তু প্রদীপের নিচেই থাকে অন্ধকার ১৯৮৩র পর থেকে নিয়ে ১৯৯১তে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের মহিলা ফুটবলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে পর্যন্ত ভারত আর এশিয়া কাপে খেলেনি টাকাপয়সা নিয়ে সমস্যা হতে থাকে এবং খেলোয়াড়দের ঠিকমতো বেতন তো দূরের কথা ম্যাচ ফিও দেওয়া হত না  কেন, তার উত্তর দেবার মতো কেউ আজ বোধহয় আর নেই!

 চাকরির জন্য শান্তিকে হকি বেছে নিতে হয়, কারণ মহিলা ফুটবল যে সংস্থা চালাত তা স্বীকৃত সংস্থা ছিল না পূর্ব রেলওয়েতে চাকরিও হয় অর্জুন, দেশের সেরা ফুটবলার শান্তি মল্লিকের হকি খেলোয়াড় হিসাবে ভারতীয় ক্রীড়াপ্রেমী হিসাবে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায় আর হ্যান্ডবল তো ছিলই খরগোশের ক্ষিপ্রতা নিয়ে মাঠেও যেমন, হ্যান্ডবল কোর্টেও শান্তি ঘুরতেন, গোল করা তো শুধু সময়ের অপেক্ষা ১৯৭৮এ যে বাংলা দল জাতীয় হ্যান্ডবল চ্যাম্পিয়ন হয়, শান্তি তার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন ছাড়া শান্তি সেপাক টাকরোতেও বাংলার হয়ে খেলেছেন ভলিবলের মত নেট, তিনজন খেলোয়াড়, খালি হাতের জায়গায় মাথা আর পা দিয়ে ফুটভলি বা সেপাক টাকরো মালয়েশিয়ার খেলা তখন ভারতেও মোটামুটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এখন আর দেখি না

   ১৯৯১এর পর এআইএফএফ মহিলা ফুটবলের দায়িত্ব নেয় বটে, কিন্তু জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করা ছাড়া সে নিয়ে বেশি কিছু করতে বা ভাবতে রাজি হয়নি কুড়ি বছরেরও বেশি সময় ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, হ্যান্ডবল খেলার পর খেলোয়াড় হিসাবে ১৯৯৬এ মাঠকে বিদায় জানান শান্তি

  তারপর? কিছুদিন বাংলাদলের দায়িত্বে ছিলেন, এমন কি বাংলা দ্বিতীয়বারের জন্য যে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয় হলদিয়ায় সেবার উনি কোচিঙও করিয়েছেন বাংলাকে।  

  বর্তমানে মেনকা সিনেমার উলটো দিকে রবীন্দ্র সরোবরের মাঠে ছোটদের ফুটবল শেখাচ্ছেন তিনি, খুবই সামান্য পারিশ্রমিকে। সরকার থেকে কোনও রকম সাহায্য ছাড়াই ভবিষ্যতের শান্তি, কুন্তলাদের তৈরি করছেন। বেসিক্সের উপর জোর দেন, বল ট্র্যাপিং, ঠিক জায়গায় পাস দেওয়া অথবা অফ দ্য বল জায়গা নেওয়া। অভিযোগ করেন, যে রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামে আট আটটি ঘর রয়েছে, যা রাজ্য সরকার নিয়ে বসে আছে। বাচ্চাগুলো যদি সামান্য পোশাক পরিবর্তনের জন্যও একটা ঘর পেত তাহলেও চলতসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বার বার বলার পরেও কিছু হয়নিরাজ্যের খেলাধুলোর বেহাল অবস্থা বোধহয় এসব ব্যাপার থেকেই স্পষ্ট হয়। 

  আজকে মেয়েদের জাতীয় লিগ হচ্ছে জ্যোতি চৌহান ডায়নামো জাগ্রেব এবং মনীষা কল্যাণ সাইপ্রাসের অ্যাপোলন এসসির হয়ে খেলছেন বালা দেবী ২০১৮য় স্কটিশ প্রিমিয়ার লিগে রেঞ্জার্সের হয়ে খেলে এসেছেন অদিতি চৌহানরা উঠে আসছেন ধীরে ধীরে আশা করা যায় অন্ততঃ এশিয়ার ফুটবল মানচিত্রে ভারত আবার জায়গা করে নেবে কিন্তু আজ থেকে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগে যে বীজ বপন করা হয়েছিল তা তো ভোলার নয় শান্তিরা বহু প্রতিকূলতাকে সামনে রেখে এগিয়ে গেছেন, আর তাঁদের বানানো ভিতের উপর ভরসা করেই ভারতীয় মহিলা ফুটবল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে