.png)
ভারতের বর্তমানে জাতীয় খেলা কী, এ প্রশ্নের এক কথায় এখন উত্তর আসবে 'ক্রিকেট'। আকরগ্রন্থে লেখা থাকতে পারে আমাদের জাতীয় খেলা 'কবাডি'। কিন্তু সে খেলাকে নিয়ে আমাদের সেন্টিমেন্ট আর আবেগের বিন্দুবিসর্গও খুব একটা চোখে পড়ে বলে মনে হয় না৷ জাতীয় পর্যায়ে স্পনসরশিপ তৈরি করে 'প্রো কবাডি'-র চ্যানেল সম্প্রচারিত যে প্রতিযোগিতার আয়োজন প্রত্যেক বছর হয় এখন, যে আবেগের ছবি সে চ্যানেলে ধরা পড়ে, তা স্বাভাবিক ছন্দে তৃণমূল স্তরে আদৌ কতটা ছু্ঁতে পারে, তা নিয়ে আমার অন্তত বিস্তর সন্দেহ আছে।
কোনও খেলায় একটি দেশ ও
জাতির সবাই অংশ নিতে পারবে না, সেটা যেমন সত্যি, এটাও সত্যি সে খেলার আবেগের একটি সর্বাঙ্গীন ও সার্বিক প্রকাশ থাকে৷ তা
প্রতিফলিত হয় সাহিত্যে, সিনেমায়,
দৈনন্দিন আড্ডায়, এমনকী এখন তো তার চরম
প্রকাশ ধরা পড়ে, মানুষের সোস্যাল মিডিয়ার পোস্টে।
এ যুক্তির মান্যতা
দিলে ৮৩'র ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের পর ভারতে ক্রিকেট নিয়ে যত বই লেখা হয়েছে,
সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, ক্লাব খোলা
হয়েছে, ক্লাব বা সাধারণ মানুষের মধ্যে উন্মাদনার
যে প্রকাশ দেখা গেছে তা অন্য খেলার ক্ষেত্রে হয়েছে কি?
এটা যদি ক্রিকেটকে নিয়ে কম- বেশি সারা দেশের ছবি হয়, তবে সে
মানচিত্রে বাঙালির অবস্থানের স্থানিক আয়তনটি কী?এটা ঠিক,
বাঙালি বিগত কয়েক দশকে ক্রিকেট নিয়ে মাতামাতি যে পরিমাণে হয়েছে, অন্যান্য খেলার ক্ষেত্রে ততটা নয়।
একটু ভুল লিখলাম। বরং
বাঙালিই বোধহয় সারা ভারতে সেই বিরল জাতি যে ক্রিকেটের পাশাপাশি বিগত কয়েক দশকে
আবেগের বহিঃপ্রকাশ করেছে ফুটবলের ক্ষেত্রেও৷ এই প্রকাশ যেমনটা শুরুতে লিখেছি সেই
পদ্ধতিতেই হয়েছে।সিনেমা, সাহিত্য, আড্ডা, পাড়া- ক্লাব খেলা, ঝগড়া, খাওয়া - দাওয়া - - জীবনের বহুক্ষেত্রেই। সবচেয়ে বড় কথা যেভাবে হয়েছে,
তা হয়েছে খুব স্বাভাবিক পথে। সাংস্কৃতিক জীবনে এই দুটি খেলা
সম্পৃক্ত ছিল বলেই তার সঙ্গে আমরা নিজেদের প্রতিনিয়ত মিলিয়ে নিতে পেরেছি।
সাহিত্যের ঠিক পাশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ' সিনেমা ' বাঙালি জীবনের এক বৃহত্তর সংস্কৃতি, বিনোদন তো বটেই। জীবনের উপাদান হিসেবে সিনেমা নির্মাতারা ফুটবলের মতো উপাদানকে শুধু গ্রহণ করেননি, তাকে বাঙালি জীবনে যে ভাবে চারিয়ে দিয়ে নির্মাণ করেছেন, তাকে এখনও পর্যন্ত বাঙালি দর্শক কোনওভাবে বর্জন করতে পারেননি। সেন্টিমেন্ট যদি সত্যিই জীবনের অংশ না হয়, তাকে যুগের পর যুগ টিকিয়ে রাখা যায় না। সিনেমার অংশ হিসাবে ফুটবল বা ফুটবলের বৃহত্তর অংশ হিসাবে সিনেমা, যে ভাবেই তাকে বলা হোক না, অন্য সব ধরনের সিনেমার সঙ্গে বাঙালি তাকেও করেছে একান্ত আপন।
বাংলা সিনেমার এমন একটা সময়কে
আমরা এ লেখায় ধরে শুরু করতে পারি, যা শুধু আমার জন্মের অনেকগুলো বছর আগেই
নয়, তার অন্তত এক যুগ পর ক্রিকেট নিয়ে
বাঙালির মাতামাতি শুরু হবে। কিন্তু সে যাক, সিনেমায় নয়
হয়নি, প্রথম খেলা বিষয়ক, মানে, ক্রিকেট নিয়ে বাংলা সাহিত্যে শিবনাথ
শাস্ত্রী অবশ্য বহুবছর আগে উপন্যাসটি লিখে ফেলেছেন। সিনেমার মতো মাধ্যম থাকলে
ক্রিকেট বা ফুটবল নিয়ে চলচ্চিত্রও হতে পারত।
একটু বড় হয়ে অবশ্য অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ' ধন্যি মেয়ে ' ( ১৯৭১) দেখি, সেই অসাধারণ ' হ্যাংওভার ', মুগ্ধতা একইভাবে আমাকে এখনও ঘিরে আছে। সামান্য গল্পলিখিয়ে হিসাবে আমি যখন এ সিনেমার গল্পকার দেবাংশু মুখোপাধ্যায়ের কাহিনিটি বিচার করতে বসি, যুগের বিচারে বেশ আধুনিক হওয়া ছাড়াও, বাঙালির ফুটবলের সেন্টিমেন্ট তার পারিবারিক ও ব্যক্তিজীবনে কোন পর্যায়ে উঠতে পারে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
যে সময়ে ফিল্মটি মুক্তি পাচ্ছে, উত্তমকুমার ও
সাবিত্রী চট্রোপাধ্যায় বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত শুধু নন,
চরিত্রের রূপায়নে তাদের বিকল্প নেই বললেই চলে। রবি ঘোষের
ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তুলনায়, জয়া বচ্চন, তপেন, সুখেন, চিন্ময়
বা পার্থ মুখোপাধ্যায় প্রায় নবাগত হয়েও উত্তম- সাবিত্রীর সঙ্গে জোট বেঁধে গল্পটির
মূল জায়গাটিকে ফুটিয়ে তুলতে যে ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তা এককথায় অনবদ্য। পুরো গল্পটি মজার, তা
অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। সেই মজার ফাঁকে আমরা নিমজ্জিত হই প্রেম এবং ফুটবলেও৷
আবার সূক্ষ্মভাবে কোথাও না কোথাও পরিচালক সিনেমাটিতে নারীশক্তিকে জিতিয়ে দেন।
সিনেমার নামকরণে বোধহয় তার প্রত্যক্ষ আভাস আছে৷
ফুটবল ছাপিয়ে পারিবারিক জীবন দাপিয়ে ঢুকে পড়ে বিজয় বসু পরিচালিত ১৯৮১ সালে মুক্তি পাওয়া 'সাহেব'-এ। গল্পের কৃতিত্ব প্রাথমিকভাবে রঞ্জন রায়ের ঝুলিতে গেলেও বিজয় বসু সে সময় চিত্রনাট্যটি সম্ভবত একেবারে নতুন করে লিখেছিলেন। চলচ্চিত্রের গল্প বা নাট্যরূপ যাই-ই থাকুক, শেষ পর্যন্ত সিনেমার গল্পটি দর্শক দ্যাখে ক্যামেরার চোখ দিয়ে। মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের আত্মত্যাগী, সেন্টিমেন্টাল ক্যারেকটার হিসাবে নিজের ইমেজ তখন তাপস পাল যেভাবে বানাচ্ছেন, তাকে ভিত্তি করে পরের একটি যুগ টলিউড যাকে বলে বাজার কাঁপানো বাণিজ্য করবে। তো সে গল্প, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের টিউনড মিউজিক, অনিল ঘোষের ক্যামেরায় মাধবী, মহুয়া, তাপস, শকুন্তলা বড়ুয়া, নীমু ভৌমিক -এর পাশাপাশি যার অভিনয় বাংলা দর্শককে কাঁদিয়ে দিয়েছিল তিনি উৎপল দত্ত। ভাল ফুটবল প্লেয়ার হওয়ার সম্ভাবনা কীভাবে বাঙালি মধ্যবিত্তের, বিশেষত যৌথ পরিবারে অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়, তার একটা সেন্টিমেন্টাল ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছিল এ সিনেমায়। গোলকিপারও যে খেলার কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তারও কোথায় জীবনের খেলায় হিরো হয়ে উঠতে পারে, তার অসাধারণ সম্পর্ক দেখানোর চেষ্টা আছে এ সিনেমায়। তবুও বাঙালি ব্যতিক্রমী দারুণ কিছু সিনেমায় ফুটবলের নিরিখে তখনও পেয়ে ওঠেনি৷
কলোনিয়াল ইতিহাস ও ফুটবল বাঙালির জীবনে অমোঘ সত্য হিসাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। খেলা, বিশেষত ফুটবলের মাধ্যমেও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ করা যেতে পারে, তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ তো বাঙালির তৈরি করা। ভারতীয় সিনেমায় অবশ্য এই ধারার শুরু ক্রিকেট দিয়ে - আমীর খান অভিনিত 'লগান'। বাংলা সিনেমায় প্রায় ১০ বছরের ব্যবধানে দুটি সিনেমা দেখতে পাচ্ছি এ পথে হেঁটেছে। তবে অবশ্যই তাদের থিম, কলোনিয়াল সময় বাঙালির স্বাধীনতাপর্বের ইতিহাস ও তার সঙ্গে জড়িত ফুটবল। একটি এগারো (২০১১) ও অপরটি গোলন্দাজ(২০২১)।
১৯১১ সালে মোহনবাগানের
সেই খালি পায়ে ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টের বিরুদ্ধে খেলে ঐতিহাসিক জয়ের ঠিক একশো
বছর পর ২০১১ তে পরিচালক অরুণ রায় ওঁর ' এগারো' সিনেমায়
সে স্বর্ণালী ইতিহাসকে ধরার চেষ্টা করেন৷ পাশাপাশি, দেশের
স্বাধীনতা আন্দোলনকে সে জয় কীভাবে প্রভাবিত করেছিল, দেখান
সে প্রেক্ষাপটও৷ মনু মুখোপাধ্যায়, শঙ্কর চক্রবর্তী,
রজত গঙ্গোপাধ্যায়, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী
বা তুলিকা বসু প্রমুখের মুখ ব্যাপক পরিচিত না হলেও অভিনয়ের শিল্পটিকে ওঁরা সবাই
মিলে ভালই উতরে দিয়েছিলেন। সে ম্যাচে মোহনবাগান জিতেছিল ২-১ গোলে। গোল করেছিলেন
শিবদাস ভাদুড়ী ও অভিলাষ ঘোষ। স্বাধীনতার স্পিরিট এ সিনেমায় বড় আকারে ধরা হয়েছে৷
শিবদাস ও অভিলাষ চরিত্রের ব্যক্তিগত জীবনের ফ্রেম এ সিনেমায় এলে তা যেন সম্পূর্ণ
হত৷
আর ঠিক এখানেই 'গোলন্দাজ'(২০২১) সিনেমার মেকিং হিসাবে আমার কাছে এগিয়ে মনে হয়েছে৷ স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস এসেছে এ সিনেমাতেও৷ এসেছেন চিত্তরঞ্জন দাশ, এমনকী বিবেকানন্দও। সামাজিক ইতিহাসের স্পষ্টতা দেখাতে পরিচালক ধ্রুব মুখোপাধ্যায় যে সেট ব্যবহার করেছেন, ইতিহাসের ঘটমান ক্রমকে যে ভাবে দেখিয়েছেন তাতে এক মধুর অভিজ্ঞতা হয়- পোশাক, বল, ভিস্তি- প্রায় সব কিছু। আবার এ সব দেখাতে গিয়ে ভারতীয় ফুটবলের জনক নগেন্দ্র প্রসাদের জীবন, ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনও এতটুকু ফোকাস থেকে নড়েনি৷ দেব, অ্যালেক্স ও' নীল, অনির্বান ভট্টাচার্য, ঈশা সাহা, ইন্দ্রাশিষ রায় ---- প্রত্যেকের অভিনয়ে ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব কথামালা তৈরি হয়। সার্বিকভাবেই এ সিনেমা তাই যখন ২০২১ ' এর ফিল্মফেয়ার পুরষ্কার জেতে, তা নিয়ে সত্যিই কিছু বলার নেই।
'গোলন্দাজ' এর গল্প যা লিখেছিলেন পরিচালক নিজেই বা সৌমিক হালদারের সিনেমাটোগ্রাফী নিঃসন্দেহে নগেন্দ্র প্রসাদের উপর আলো ফেলার জন্য। বাঙালির ফুটবলের ইতিহাসকে আলোকিত করার জন্য। ক্লাব কালচার কীভাবে ফুটবলে এসেছে, তা যেমন জানতে পারি, অবগত হই 'শোভাবাজার ক্লাব' (১৮৮৫) বা ময়দান কালচার সম্পর্কে। দেখতে দেখতে আশা জাগে যে নগেন্দ্র প্রসাদের নামের পাশে কালীচরণ মিত্র, হরিদাস শীল, বা মন্মথ গঙ্গোপাধ্যায়ও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নাম৷ এঁদের বায়োপিকও আমরা অনতিবিলম্বে পেতে চলেছি। এবং 'গোলন্দাজ'-এর মতোই গবেষণাধর্মী ঐতিহাসিক সময় ও প্রেক্ষাপট আমরা সে সব সিনেমায় মূর্ত হতে দেখব৷
যে সমস্ত ফুটবলভিত্তিক
সিনেমাগুলির কথা এখানে উঠে এলো, তারাই মোটেও একমাত্র সিনেমা নয়। ২০১৫ ও
২০১৭ সালে যথাক্রমে মুক্তি পায় 'লড়াই' ও 'মেসি' নামের দুটি
ছবিও৷ মনে পড়ছে, 'ইস্টবেঙ্গলের ছেলে', 'মিত্তির পাড়ার মারাদোনা', 'পাড়া থেকে', 'যুগ যুগ জিও'-র কথাও। এই সমস্ত সিনেমায় ফুটবল
জড়িয়ে আছে প্রত্যক্ষভাবে, কাস্ট কাস্টিংও নামী তারকাদের।
বাঙালির সিনেমার ইতিহাস ও ম্যাপেও ফুটবল জুড়ে আছে অনেকটা জায়গা।
.jpg)
0 মন্তব্যসমূহ
Nice