ফিনিশ থেকে ফিনিক্স                                                            ফিচার 

সৌভিক ঘোষ    

 ১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপে স্পষ্টতই ফেভারিট ছিল ব্রাজিল। সাথে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা পশ্চিম জার্মানী। কিন্তু বিশ্বমঞ্চে যাবতীয় লাইমলাইট শুষে নিয়ে নায়ক হন এমন একজন যিনি বিশ্বকাপের মাত্র নয় সপ্তাহ আগে ফেরেন নির্বাসন থেকে।                                                   
      
    ১৯৮২ বিশ্বকাপের অবিসংবাদিত নায়ক ছিলেন এহেন পাওলো রোসিই। বিশ্বকাপের ঠিক আগে অর্থাৎ ১৯৮০ সালে গড়াপেটা কাণ্ডে উত্তাল হয়ে ওঠে ইতালি ফুটবল। কুখ্যাত টোটোনেরো কাণ্ডে জড়িত থাকার জন্য দেশজুড়ে ধরপাকড় শুরু হয়। দোষী সাব্যস্ত হন ১১ ফুটবলারও। গোটা ইতালি স্তম্ভিত হয়ে দেখে জড়িত ফুটবলারদের হ্যান্ডকাফ পরিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে ড্রেসিংরুম থেকে। রোসি তখন ২৩ বছরের। ইতিমধ্যেই একটি বিশ্বকাপ খেলে ফেলেছেন। শুধু খেলে ফেলেছেন তা নয় বিশ্বকাপে নিজের নামের পাশে বসিয়ে ফেলেছেন গোলও। অখ্যাত ভিসেঞ্জার হয়ে ৪৫ গোল করে তাদের তুলে এনেছেন সিরিয়া -তেও                
   ইতালির ফুটবল গড়াপেটা চালাতেন সেসময় মূলতঃ দুজন আলভারো ট্রিনকা ম্যাসিমো ক্রুসিয়েনি নামক দুই ছোট ব্যবসায়ী তাঁদের হাত ধরেই কোটি কোটি টাকা আসছিল বেটিং সিন্ডিকেটে। ম্যাচের ফলাফল প্রভাবিত করতে তাঁরাই ঘুষের প্রস্তাব দিতেন ফুটবলারদের। গোটা ইতালি অবাক হয়ে দেখে তদন্তের শেষ পর্বে কোর্টে তলব করা হয়েছে রোসিকেও।  বিচারে দোষী সাব্যস্ত হন রোসি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে একটি ম্যাচ - গোলে শেষ করতে সাহায্য করেছেন তিনি। তবে তাঁর বিরুদ্ধে দাখিল করা প্রমাণ ছিল যথেষ্ট দুর্বল। কিন্তু রোসি সাক্ষ্য দিতে চাননি তাঁর সতীর্থদের বিরুদ্ধে। সেই অভিযোগেই ইতালিয়ান ফুটবল এসোসিয়েশন তিন বছরের জন্য নির্বাসিত করে রোসিকে।           

  ইতালির কোচ তখন এনজো বেয়ারজত। ১৯৮০ তে ইতালিরই আয়োজন করা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ইতালি চতুর্থস্থানে শেষ করে। সিঁদুরে মেঘ দেখেন এনজো। টিমের সেরা স্ট্রাইকারকে ছাড়া তখন চোখে অন্ধকার দেখছে ইতালি। ইউরোপিয়ন চ্যাম্পিয়নশিপের ঠিক পরেই নির্বাসনের মেয়াদ কমে রোসির। তিন থেকে দু বছর হয়। নির্বাসনমুক্তি হতে হতেই দামামা বাজে স্পেন বিশ্বকাপের। কোচ এনজো সবাইকে জাতীয় দলে ডাকেন রোসিকে। ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ইতালি মিডিয়া। প্রায় প্রত্যেকদিনই নিয়ম করে বিঁধতে থাকে এনজোকে কিন্তু নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন এনজো। পোল্যান্ড, পেরু ক্যামেরুণের সাথে ড্র করে কোনমতে পরের রাউন্ডে ওঠে ইতালি। রোসি গ্রুপ লীগ জুড়ে নিষ্প্রভ ছিলেন আগাগোড়াই।  

  পরের রাউন্ডে ব্রাজিলকে - গোলে হারায় ইতালি। টুর্নামেন্ট জুড়ে গোলহীন রোসি প্রথম ম্যাচ মিনিটেই দলকে এগিয়ে দেন গোল করে। তাঁর হ্যাটট্রিকেই টুর্নামেন্টের বাইরে চলে যায় ফেভারিট ব্রাজিল। রাতারাতি গোটা ইতালির নায়ক হয়ে যান রোসি। সেমিফাইনালে রোসিরই জোড়া গোল পোল্যান্ডকে - গোলে হারায় ইতালি। ফাইনালেও পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে গোল করে দেশকে চ্যাম্পিয়ন করেন 'ফিনিশড' রোসি। একইসঙ্গে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরষ্কারস্বরূপ গোল্ডেন বল টুর্নামেন্ট সেরা হিসাবে গোল্ডেন বুট পান রোসি।

   জিনিয়সারা এমনই হন। আউট অফ কন্টেক্স থেকে উঠে আসেন সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে। গোটা বিশ্ব যাঁকে বাতিল বলে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছিল তাঁরই রিসারেকশন হয়। পরে সেটাই হয়ে যায় পাঠ্য। রোসির গল্পটাও কার্যত এমনই রূপকথাসমই ছিল।