.png)
বর্ণচোরা ছোটগল্প
সুব্রত বসু
মাজদিয়া আদর্শ সংঘের মাঠে আজ ফাইন্যাল খেলা। স্থানীয় দল জয়দেব স্মৃতি সংঘের সঙ্গে প্রদীপ বিশ্বাসের দল বাস্তুহারা স্পোর্টিং ক্লাব। এরা খেলতে এসেছে, এর আগে পাঁচটা ম্যাচ জিতে ফাইন্যালে উঠেছে। এত দূরে খেলতে আসার উদ্দেশ্য –-- শিল্ডের সঙ্গে পঁচিশ হাজার টাকা ক্যাশ প্রাইজ, এছাড়াও ম্যান অফ দ্য ম্যাচের জন্যে পাঁচ হাজার টাকা। প্রদীপ একাধারে কোচ, খেলোয়াড়, অধিনায়ক সব কিছু। নিজের হাতে গড়া প্রত্যেকটি ছেলে। মনে মনে একটু আত্মশ্লাঘা অনুভব করে এর জন্যে। আজ মাঠে এসে শুনল বিপক্ষ দল কলকাতা থেকে বেশ কিছু খেলোয়াড় হায়ার করে নিয়ে এসেছে। তারা কেমন খেলে সেটা জানার থেকে বড় কথা হল এই খবরটা ছড়িয়ে দিয়ে বিপক্ষ দলের মনবলের ওপর আঘাত করা হয়। প্রদীপ এটা জানে, তাই সহ খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে বলল, “শোন এতে ঘাবড়াবার কিছু নেই, কলকাতা মানেই যে ওরা তোদের থেকে ভাল খেলে তার কোন মনে নেই। ওরা কলকাতায় খেলার সুযোগ পেয়েছে তোরা পাসনি, গ্রামে আছিস বলে। হীনম্মন্যতায় ভুগবি না। নিজেদের সেরাটা দেবার চেষ্টা করবি। এতগুলো টাকা পেতে হলে লড়াই করতে হবে”। সব শুনে হাবুল বলল,“স্থানীয় দল, রেফারী ওদের টেনে তো খেলাবেই”। “ওটা সব টুর্ণামেন্টেই হয়ে থাকে, লোকাল দলের ওপর পক্ষপাতিত্ব থাকবে, তবে প্রদীপদা ঠিক কথাই বলেছে, ওসব মাথায় না রেখে আমাদের নিজস্ব খেলাটা খেলতে হবে”। বিদ্যুৎ একটু সাহসী খেলোয়াড়, ওর মুখে এই কথা মানায়। ওইই প্রদীপের টিমে মেন স্ট্রাইকার। গোলটা খুব ভাল চেনে। বিদ্যুৎ বলল, “পুলিশ এসেছে, গন্ডগোল হতে পারে”। বুটের লেস বাঁধতে বাঁধতে একবার মুখ তুলে দেখে নিল।
কয়েকজন পুলিশ চেষ্টা করছিল যারা খেলা দেখতে এসেছে সাইড লাইন ছেড়ে খানিকটা জায়গা রেখে যেন তারা বসে। সামনের লোক বসলেও পিছনের দর্শকরা দাঁড়িয়েই থাকল। দর্শকদের প্রায় সকলেই জয়দেব স্মৃতি সংঘের সমর্থক। তবে কিছু বয়স্ক লোক আছে যাঁরা খেলা দেখতে দেখতে খেলোয়াড়ের গুণে সেই দলের সমর্থক হয়ে যান। এই কথাটাই প্রদীপ সেদিন বলছিল। এর আগে পাঁচটা ম্যাচ জিতে ফাইন্যালে উঠেছে, সেইসময় দর্শকরা ওদের খেলার প্রশংসাই করেছিল।আজকে ভাল দর্শক সমাগমের কারণ সেটাই বলে মনে হল প্রদীপ। যেহেতু স্থানীয় দল ফাইন্যালে খেলছে , সেই সাপোর্ট তো ওরা পাবেই। এটাই স্বাভাবিক।
ফুটবল খেলার একটা অলিখিত নিয়ম উভয়পক্ষই মাঠে নেমে যে কোন একটা দিক বেছে নেয় আর ফাঁকা গোলে একটা শট করে। তারপর তো গোলকিপারকে প্র্যাকটিশ দেয়, বিভিন্ন ভাবে গোলে শট নিয়ে, এইভাবেই দুপক্ষ খেলার আগে গা গরম করে নেয়। প্রদীপদের গোলকিপার নিখিল কমবয়সী ছেলে, ভীষণ এনার্জি। সারাক্ষণই লাফাচ্ছে। এটা কিছুটা নার্ভানেস কাটাবার প্রচেষ্টা। যতই হোক ফাইন্যাল ম্যাচ বুকের মধ্যে একটা গুরগুরুনি থাকে। বলটা গ্রিপ করার পর কখনো ছুঁড়ে, কখনো শট মেরে সহ খেলোয়াড়ের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎই নিখিলের শট মেরে ফেরত দেওয়া বল, খেলোয়াড়ের মাথা টপকে ড্রপ খেয়ে দর্শকের মাঝে চলে গেল। কিন্তু বলটা মাটিতে পড়ার আগেই গেরুয়া ধুতি পরা একটা লোক বাঁ পায়ে বলটাকে নিয়ন্ত্রণে এনে ডান পায়ে ঘুরে গিয়ে ভলি করল। আশ্চর্যের কথা অতদূর থেকে বলটা উঁচু হয়ে বার পোস্টের প্রায় কোণ দিয়ে গোলে ঢুকে গেল নিখিলের কিছু বোঝার আগেই। দর্শককূল আনন্দে চিৎকার করে উঠল “গোল” বলে, সঙ্গে হাততালি থামতেই চায় না। ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক চোখে তাকাল প্রদীপ, গেরুয়া পোষাকে শরীর ঢাকা লোকটি তখন হাসছে। লম্বায় প্রায় ছ’ফুট, মাথায় হাল্কা কোঁড়ানো সোনালী চুল, গায়ের রঙ তামাটে। সন্ন্যাসীটি যে বিদেশী তা একনজরেই বোঝা যায়। পাশে আর একজন মাথায় একটু খাটো, তবে এদেশীয় বলেই মনে হয়, সেও হাসছিল।
কিছুক্ষণের মধ্যে খেলা শুরু হল বটে, কিন্তু কৌতুহল এমন জিনিষ প্রদীপ কিছুতেই তার স্বাভাবিক খেলা খেলতে পারছে না। গোটা দলটাই কেমন যেন কুঁকড়ে রয়েছে। একটা বল নিয়েও সেন্টার লাইন ক্রস করতে পারেনি। ফাইন্যাল খেলার টেনসান। তবে তা কেন, এই ধরনের ম্যাচ তো ওরা আগেও খেলেছে, তাহলে! প্রদীপ নিজেই বা কি করছে, কিন্তু কে এই বিদেশী, কোথা থেকেই বা এল। যার একটা শটে দলের সবাই আচ্ছন্ন হয়ে গেল। রীতিমত অভ্যস্ত না হলে কি সম্ভব! মনটা এমন বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে, কৌতুহলের কারণে খেলায় মন দিতে পারছে না। এই দোনোমোনোর মাঝখানেই বাস্তুহারা স্পোর্টিং ক্লাব একটা গোল খেয়ে গেল। রক্ষণ ভাগ যেন দাঁড়িয়ে দেখল গোল হওয়াটা। গোটা মাঠ জুড়ে উল্লাস। বিপক্ষদলও নেচে মাঠে গড়াগড়ি খেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে। এগুলো বিপক্ষদলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। অনেক দিন ফুটবল খেলছে প্রদীপ জানে ওসব, তাই সেদিকে দৃষ্টিপাত না করে সব খেলোয়াড়দের ডেকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যেটুকু বলার বলে নিল। অনেকবারই এরকম পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে, তাই ঘাবড়ালো না। পূর্ণ উদ্যোমে খেলা শুরু করল, তেমন কিছু ঘটার আগেই রেফারী হাফ টাইমের বাঁশি বাজিয়ে দিল।
সহ
খেলোয়াড়ের সঙ্গে মাঠের বাইরে চলে গেলেও প্রদীপ কিন্তু খুঁজতে লাগল, সেই গেরুয়া
পোষাকধারী সন্ন্যাসীকে। জমাট দর্শকের ভিড় ফাঁকা হয়ে মাঠের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে। এত
লোকের মধ্যে কাউকে খুঁজে বার করা সত্যিই কঠিন, ভরসা একটাই
গেরুয়া পোষাক পরে তো আর কেউ থাকবে না । ফলে প্রদীপের চোখে পড়তে দেরী হল না। দুই
সন্ন্যাসী ভিড় ছেড়ে কিছুটা দূরে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছে নীচে দাঁড়িয়ে আছেন। উৎসুক
চোখে প্রদীপ এগিয়ে গেল। সামনে গিয়ে ইংরিজিতেই প্রশ্ন করল, “আর ইউ ফরেনার? ফ্রম হুইচ কান্ট্রি?”
“ইয়েস। আয়াম”। এরপরের কথাটা শুনে প্রদীপ শুধু অবাকই হল না তার অবিশ্বাস্য মনে হল। “বাট আই নো বেঙ্গলী লাইক ইউ”। “আপনি বাংলা জানেন?” “অবশ্যই, আমার নাম স্মরণানন্দ প্রভু, আমি ইস্কনের সন্ন্যাসী, ইনি কৃপামৃত প্রভু ”। হাত জোড় করে নমস্কার করল প্রদীপ। প্রত্যুত্তরে দুজনেই বলল, “হরে কৃষ্ণ”। প্রদীপের মুখ দিয়েও হরে কৃষ্ণ শব্দটা আপনাআপনি বেরিয়ে এল। “আপনি ফুটবলার ছিলেন?’ কথা শুনে স্মরণানন্দ প্রভু হাসলেও কৃপামৃত প্রভু বললেন, “আরে ওর দেশটাই তো ফুটবলের, উনি ব্রাজিল থেকে এসেছেন”। প্রদীপের একবার মনে হল নীচু হয়ে পায়ের ধুলো নেয়। নিজেকে সংযত করল। কি বলবে, কি বলবে না ভেবে পাচ্ছিল না। সেই মুহুর্তেই রেফারীর বাঁশি দ্বিতীয় অর্ধের খেলা শুরু হতে চলেছে। ''আপনি যাবেন না, খেলার শেষে আপনার সঙ্গে অনেক কথা আছে , কাইন্ডলি থাকবেন খানিকক্ষণ”। “ যে ছকে খেলছ তাতে তোমরা হেরে যাবে, গোল শোধ করতে পারবে না”। মরিয়া হয়ে প্রদীপ জিজ্ঞাসা করল “তাহলে” “ফরোয়ার্ডে রাইট পজিশন থেকে একজনকে হাফে নামিয়ে দাও, রাইট ব্যাককে ওভারল্যাপ করতে বলো। বল ডিস্ট্রিবিউশন ভাল হবে, ওদের লেফট উইং এ যে প্লেয়ারটা খেলছে ওকে মার্কিং করো”।
কোন রকম প্রশ্ন না করে ওই সন্ন্যাসীর কথামত দ্বিতীয় অর্ধে খেলা শুরু করে দিল বাস্তুহারা স্পোর্টিং ক্লাব, মিনিট পনেরোর মধ্যেই সকলে বুঝতে পারল প্রথম অর্ধের খেলার সঙ্গে দ্বিতীয় অর্ধের খেলার তফাৎ। রঞ্জিত একটু সক্রিয় হলে এক্ষুণি গোল শোধ হয়ে যেত। নিজে মারবে না বিদ্যুৎ’কে দেবে এই সিদ্ধান্ত নিতে যে সামান্য দেরী হল তাতেই ওদের রাইট ব্যাক বলটা ক্লিয়ার করে দিল। যেহেতু তারা একগোলে জিতছে, তাই নিজেদের রক্ষণ ভাগে খেলোয়াড় বাড়িয়ে চলল, ফলে প্রদীপের দলে যাবতীয় আক্রমণ বারে বারেই প্রতিহত হয়ে ফিরে আসছিল। কোন অবস্থাতেই তারা এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে চাইছে না। সময় যত চলে যাচ্ছে নিজেদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। আক্রমণ ভাগের প্রতিটি খেলোয়াড়কেই কেউ না কেউ মার্কিং করে রেখেছে। গোলের মুখে জটলা হচ্ছে, কিন্তু গোল হচ্ছে না। খেলা শেষ হতে খুব একটা বাকি নেই। প্রদীপ প্রথম থেকেই একটু নেমে খেলছিল। বলটা ধরে রাইট ব্যাককে পাস করে হাতের ইসারায় ওভারল্যাপ করতে বলল, নিজেও ওর সঙ্গে মাঝ মাঠ দিয়ে দৌড়তে শুরু করল। যেহেতু বল রয়েছে ডান দিকের সাইড লাইনে সকলের চোখ সেই দিকে। প্রায় কর্ণার ফ্ল্যাগের কাছাকাছি গিয়ে মাইনাস করল নবেন্দু, ঠিক গোলের মাঝখানে নয় একটু আগে, ওদের একজন খেলোয়াড় উঁচু হয়ে আসা বলটা লক্ষ্য করছিল, প্রদীপকে সে দেখেনি। দুরন্ত গতিতে লাফিয়ে বলটা কপালের মাঝখান দিয়ে সামান্য ঘুরিয়ে দিল গোলের দিকে। গোলকিপারের বুঝতে সেকেন্ডের কয়েক ভগ্নাংশ দেরী হয়েছিল, তবু সে একটা সর্বাত্মক চেষ্টা করে। বলটা হতে লেগে গোলে ঢুকে গেল। নিজেরা কোনরকম সেলিব্রেট করল না। সামান্য দু’একটা হাততালি। সেন্টার হবার দু’মিনিটের মধ্যেই খেলা শেষের বাঁশি বেজে গেল।
মানসিক
ভাবে প্রদীপরা প্রস্তুতই ছিল অতিরিক্ত সময় খেলার জন্যে। এইভাবেই সহ খেলোয়াড়দের
নির্দেশ দিচ্ছিল পরর্বতী সময়ে কি করতে হবে। হঠাৎ চমক ভাঙ্গল খেলা শুরু হতে দেরী
হচ্ছে। এর পরের ঘোষণা হল,
কোনো অতিরিক্ত সময় খেলা হবে না, উভয়
দলকে যুগ্ম বিজয়ী ঘোষণা করা হবে। যেহেতু স্থানীয় দল টুর্নামেন্ট কমিটি কোন রকম
ঝুঁকি নিল না, যুগ্ম বিজয়ী ঘোষণা করে দিল। দ্বিতীয়ার্ধে
প্রদীপদের খেলা দেখে হয়ত মনে হয়েছিল স্থানীয় দল হেরে যেতে পারে। তাই এই সিদ্ধান্ত।
পুরস্কার বিতরণী সভা কিছুক্ষণের মধ্যেই আরম্ভ হবে। প্রদীপের আর কোন উৎসাহ নেই,
সহঅধিনায়ক বিজয়কে বলে দিল পুরস্কার নিতে। আজকের ম্যাচটা জিততে চেয়েছিল , সেকেন্ডে হাফে
খেলাটা যখন ধরে গোল শোধ করল তার কয়েক মিনিটের মধ্যে ফাইন্যাল হুইসিল পড়ে গেল, এক্সট্রা টাইম
খেল হলে ওরা নিশ্চিত জিততো। এর চেয়ে আর বেশী ভাবতে
চাইছে না প্রদীপ। উৎসুক চোখে ভেঙ্গে যাওয়া ভিড়ের মধ্যে খুঁজে বেড়াতে লাগল সেই
গেরুয়াধারী দুই সন্ন্যাসীদের।

0 মন্তব্যসমূহ
Nice