নারীত্বের অধিকারে: ভারতবর্ষে মেয়েদের ফুটবল বিশেষ রচনা
নির্মাল্য চট্টোপাধ্যায়
ভারত কেন, সারা বিশ্বের সামাজিক পরিকাঠামোতেই ক্রীড়াক্ষেত্রে নারীর স্থান ছিল একদমই সংকুচিত। ১৮৯৬ সালে অনুষ্ঠিত আধুনিক যুগের প্রথম অলিম্পিকের মেয়েদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল। আধুনিক অলিম্পিকের জনক
‘পিয়ের দ্য কুবের্তিন’
স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন,
মেয়েদের খেলাধুলা হচ্ছে
‘‘unpractical, uninteresting, anaesthetic, and we are not afraid to add —
incorrect.’’ ফলে কোন উত্তরাধিকার বহন করে নারীজাতি খেলাধূলোর মাঠে অবতীর্ণ হয়েছিল,
বোঝাই যাচ্ছে। আর তার সঙ্গে যদি যুক্ত করি ভারতবর্ষীয় সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত,
তার আজন্মলালিত সংস্কার,
সেই সংস্কার বজায় রাখার বিভিন্ন ধাঁচা আর নিদানকে—
আজ এই সময়টায় দাঁড়িয়ে ভারতীয় নারীর খেলাধূলার জগতে প্রবেশ,
বিশেষ করে ফুটবল মাঠে তার স্বাধিকার অর্জনের প্রয়াসকে অবিশ্বাস্য মনে হওয়াই স্বাভাবিক।
ফুটবল শারীরিক সক্ষমতা ও তার প্রয়োগ দাবি করে। বিশেষ করে ‘রমণীয়তার সামঞ্জস্য রেখে ফুটবল নৈপুণ্য মেয়েদের জন্য যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং।’ কিন্তু ‘নারীত্বের অনেক বৈশিষ্ট্যের মাঝে ধৈর্য্য একটি অসাধারণ উপাদান। আর সেই ধৈর্য্য মন্ত্রেই মেয়েরা হাজার প্রতিকূলতা সত্ত্বেও টিঁকে আছে ফুটবল রণাঙ্গণে।’ এই ধৈর্য্য যেমন দেখাতে হচ্ছে সংসারের দাবিগুলোকে সামলেসুমলে রেখে মাঠের দিকে আসতে গেলে, তেমনি মাঠের ও খেলার পরিকাঠামোর হাজারটা অসুবিধার প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হয়েও খেলার স্বপ্ন আর জেদটাকে বুকের মধ্যে লালন করার মধ্যেও। এই জেদটা যেন বেঁচে থাকার জেদের মতই অদম্য, কঠিন। বিল শ্যাঙ্কলির সেই অনবদ্য উক্তিটা উল্লেখ করাই যেতে পারে– ‘Some people think football is a matter of life and death. I assure you, its much more serious than that.’ এই উক্তির যাথার্থ্য বা গভীরতা ছেলেদের ফুটবলের ক্ষেত্রে যতটা প্রযোজ্য, তর হাজারগুণে বেশি প্রযোজ্য মেয়েদের ফুটবলের ক্ষেত্রে, ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায়, এই একবিংশ শতাব্দীর সিকিভাগ অতিক্রান্ত হওয়ার মুখেও।
কিন্তু এই
‘সিরিয়াসনেস’টাকে আমরা পাত্তা দিই ক’জন?
এখনও ‘মহিলা ফুটবল’ শুনলে মুখ বাঁকিয়ে প্রতিক্রিয়া দেওয়ায় অভ্যস্ত আমরা আদৌ কি বুঝতে পারছি এই
‘সিরিয়াসনেসের’ নির্যাসটাকে? কীসের জোরে একটা রোগা পাতলা মেয়ে ভোরবেলা উঠে,
আগের রাতে জলে ভেজানো পান্তা খেয়ে, সংসারের কর্তব্যগুলো সেরেসুরে, মাইলের পর মাইল উজিয়ে হাজির হয় ফুটবল খেলতে? এই প্রশ্নের তল পেতে গেলে বিজ্ঞান ছেড়ে দর্শনের আশ্রয় প্রত্যাশা করাই যুক্তিযুক্ত মনে হতে বাধ্য।
মেয়েদের ফুটবলের এই জেদ, তার হাজারো গল্প আর সংখ্যাতত্ত্ব, ইতিহাস নিয়ে উঠে এসেছে বিশিষ্ট ক্রীড়া–সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপিকা পৌলমী ঘোষের ‘ভারতীয় নারী: ফুটবল মাঠে’ গ্রন্থে। নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, আর দেখে-চলা জীবনের খুঁটিনাটি ছেঁকে লেখা এই
‘একটু অন্যরকম’ বইয়ের পাতায় পাতায় তাই ঝলক দেয় মেয়েদের ফুটবলের বঞ্চনা। তাকে অতিক্রম করতে হাতে–হাত রাখার গল্প, সামাজিক নানা কটুক্তি গিলে ময়দানে থেকে যাওয়ার ইতিহাস। যুগ যুগ ধরে এই
‘ধন্যি মেয়ে’গুলোর মুখ-ঝামটা আর লাথি-ঝাঁটা খেয়েও উত্তরণের মাধুর্য।
বইটির মধ্যে বিষয় হিসেবে এসেছে ‘নারীবাদ’, ‘নারী শরীরতত্ত্ব’, ‘নারী মনস্তত্ত্ব’, ‘ভারতীয় পরিসর’, ‘ভারতীয় সমাজ’, ‘কুসংস্কার’, ‘অর্থনীতি’ এবং এগুলো সত্ত্বেও মহিলা ফুটবলে ভারতের ‘সাফল্য’। ফলে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে পৌলমী ঘোরাফেরা করেছেন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থেকে সংঘবদ্ধ আবেগ, দাঁতে-দাঁত-চাপা সংগ্রাম, সীমাহীন বঞ্চনায় এবং এসে পৌঁছেছেন অতীব সম্ভবনাময় আশাবাদে। বৃত্তি বা জীবিকার আসার মধ্য দিয়ে, খুদকুঁড়োর জীবন থেকে উত্তরণের স্বপ্নিলয়ে প্রচেষ্টা চলছে গত পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে— পৌলমী দলিল লিখেছেন তারই।
ভারতীয় থাকবন্দী সমাজের প্রথাগত রক্ষণশীলতা, বিশেষ করে নারী, নারীত্ব এবং তার ঘরকন্নার উত্তরাধিকার মেয়েদের ফুটবল মাঠে আসার যে প্রতিবন্ধকতা যুগের পর যুগ ধরে নির্মাণ করে এসেছে, তা কি কেবল সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙ্গে পড়ল? স্বাভাবিক নিয়মে? না কি তার পেছনে রয়ে গেল এতদিনের পর্দানসীন কিছু তত্ত্ব ও তথ্য, যা অবশেষে, গত প্রায় দু-দশকেরও বেশি সময় ধরে মেয়েদের সাবলীল করে তুলল ফুটবল মাঠে? এই প্রশ্নগুলোর পদে পদে হাজারো আলো-আঁধারি, একটা প্রশ্নের উত্তরের পাশে উঁকি দিয়ে যায় বিরোধী কিছু উপাখ্যান। পড়তে পড়তে তাই মনে হয়, ফুটবল মাঠে নারীত্বের উদযাপনের ইতিহাস লিখতে গেলে গোটা নারীজাতির অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎই যেন উন্মুখ হয়ে রয়, প্রকাশের আশায়।
এই যে রক্ষণশীলতার ধাঁচা, এটাকে সজোরে ধাক্কা মারে মেয়ে ফুটবলারদের প্রেরণা হিসেবে বাবা-মায়ের নিঃস্বার্থ সমর্থনকে, তাঁদের সহযোগিতাকে অকপটে স্বীকার করা। পৌলমী পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছেন, ২০১৪ থেকে ২০১৭’র মধ্যে রাজ্য ও জাতীয় স্তরে যে সকল মেয়েরা ফুটবল খেলে, তাদের মধ্যে ১৪ বছর বয়সী ৭০ শতাংশ মেয়েরা বাবা-মায়ের থেকে উৎসাহ পেয়েছে। এই ৭০ শতাংশকে আরো সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে আবার ৬৩.৬৭ শতাংশ উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত, ৭২.২২ শতাংশ তপশিলী জাতির এবং ৮০ শতাংশ হিন্দু বাবা-মায়ের সন্তান। এমনকি, ৬৬ শতাংশ মুসলিম পরিবার থেকে এসেছে। ১৯-২০ বছর বয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যান আরো আশাবাদী করে তোলে।
তবে, আঁধারের জায়গাটা অন্য। এই সংখ্যার অধিকাংশই নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা। সত্যি বলতে কী, উচ্চ বা মধ্যবিত্ত সমাজ এখনও মেয়েদের ফুটবল খেলাকে সার্বিক স্বীকৃতি দেওয়ার থেকে বহুদূরে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে, নিউিক্লিয়ার ফ্যামিলির পরিকাঠামোতে যে সমর্থন অন্তত: কন্যাসন্তানের টেনিস, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস বা নিদেনপক্ষে অ্যাথলেটিক্স পাচ্ছে, তা কিন্তু ফুটবলের ক্ষেত্রে জুটছে না। গ্রাম বা মফ:স্বলে উৎসুকদের পেছনে পড়শিদের যে ভূমিকা, সেটাও নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির নিরিবিলি ফ্ল্যাটে মেলে না। ফলে ‘ক্ষিদ্দা’দের কাছে পৌঁছনোই হয় না বহু ‘কোনি’র। বিদ্যালয় স্তরে বা কলেজ স্তরেও এখনও খেলোয়াড় মেয়েদের স্বীকৃতি প্রদান কিছুটা বিক্ষিপ্ত, ফলে নিজেদের বিচ্ছিন্ন ভাবার প্রবণতাকে দোষ দেওয়া যায় না। সেই সঙ্গে রয়েছে, এই মেঠো খেলার শারীরিক দাবির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মেয়ের শারীরিক গঠনকে প্রশ্নের চোখে দেখার প্রবণতা, রকের আড্ডায় কান পাতলে মেয়ে ফুটবলারদের ‘লেসবিয়ান’ বা ‘ট্রান্সজেন্ডার’ গোত্রে ফেলতে আপনার বিন্দুমাত্র সময় লাগবে না।
আমাদের এইসব মানসিক দর্শন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেছেন পৌলমী, তাঁর পেশাগত ও অধিগত বিদ্যার পারদর্শিতায়। আর দেখিয়েছেন, তথাকথিত ‘নারীবাদী দর্শনের রমরমার মধ্যেও পুরুষ ফুটবলের থেকে মহিলা ফুটবলের সর্বভারতীয় বাজেট কত কম; তার প্রচার এতটাই কম যে কেউ জানেই না আমাদের মেয়েরা কবে কোথায় খেলতে যাচ্ছে। আর, একটা অস্পষ্ট চাহিদা তৈরি হলেও তাকে বাজারজাত করবার ন্যূনতম পরিকাঠামোর কোনও উদ্যোগই সেই অর্থে গড়ে ওঠেনি। তবু, চাকুরিগত ক্ষেত্রে মহিলা ফুটবলারের অন্তর্ভুক্তি এই চাহিদাটাকে পেছন থেকে ঠেলছে। এ যেন ষাট-সত্তর-আশির দশকে কলকাতা ময়দানে গ্রাম-মফস্বলের পুরুষ ফুটবলারেদর মরিয়া লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি! কিন্তু পুরুষ ফুটবলের যে পরিকাঠামো তার শতাংশ মাত্র অর্জন করেছে মহিলা ফুটবল। কলকাতা ময়দানে তিন প্রধানের মধ্যে একমাত্র ইস্টবেঙ্গল ছাড়া, মোহনবাগান বা মহামেডান স্পোর্টিং মহিলা ফুটবল দল রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেনি। সেই সঙ্গে টেলিভিশন সম্প্রচার বা খবরের কাগজে প্রচারের খামতি তো রয়েই গেছে!
কেন এই খামতি? স্বাধীনতার ৭০-৭৫ বছর পরেও মহিলা ক্রীড়ায় সে ফুটবলে হোক বা অন্য খেলায়, পুরুষ কোচেরই প্রাধান্য। তারই প্রতিফলন বিভিন্ন চলচ্চিত্র মাধ্যমে, যেখানে পুরুষ ছাড়া নারীশক্তির উদ্বোধন আমাদের সাহসে কুলোচ্ছে না! পৌলমী এই সমস্ত প্রশ্নকে ঘাড় ধরে সামনে এনেছেন, নৈর্বক্তিক বিশ্লেষণে বে-আব্রু করেছেন আপাত-রঙিন বাস্তবকে। ফলে এই বই, এই বিষয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হবার দাবি রাখে। পথিকৃৎও বটে, যখানে ক্রীড়া-গবেষণা বিষয়ক মহিলা ক্রীড়া নয় বাদই দেওয়া গেল, তেমন কোনও বই বাংলা-বাজারে নেই। শেষে বলি, পৌলমী শুধু অ্যাকাডেমিক পরিসরেই লেখনীকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, নিজের কর্মদ্যোগে সংগঠন করা মহিলা ফুটবলের প্রতিযোগিতার বর্ণনাও দিয়েছেন বইয়ের শেষাংশে।যা বোঝায়, মাঠে নেমে কাজটা করতে তিনি নিস্পৃহ নন। রয়েছে খুঁটিনাটি জরুরি পরিসংখ্যানও।
তবে বিজ্ঞানগত অধ্যায়গুলির ভাষা আরেকটু সরল ও প্রাঞ্জল হলে ভালো হত। গবেষণা বই হয়ে বেরোলে কিছুটা নির্মেদ রূপ দাবি করে। আকারে না হোক, প্রকারে।
বইটিতে মুদ্রণ প্রমাদ প্রায় নেই বললেই চলে। এ ব্যাপারে প্রকাশক ‘অহর্নিশ’ চিরকালই ব্যতিক্রমী ও উদাহরণযোগ্য।
শান্তি মল্লিক, কুন্তলা ঘোষদস্তিদার বা বেমবেম দেবীদের দেশে এই বইয়ের মহিলা ফুটবলের সামাজিক স্বীকৃতি ও সার্বিক উদযাপনের ভগীরথ হয়ে ওঠা উচিত। উৎসুক পাঠক হাতে তুলে নিলে ঠকবেন না।
‘ভারতীয় নারী: ফুটবল মাঠে’ - পৌলমী ঘোষ
প্রকাশক: অহর্নিশ
মূল্য: ৪০০ টাকা
১৮৪ পাতা
2 মন্তব্যসমূহ
অসাধারণ আলোচনা। ধন্যবাদ জানাই সম্পাদক এবং আলোচককে
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ
মুছুনNice